শাহারুল ইসলাম ফারদিন, যশোর প্রতিনিধি:
কারাগারে
বন্দি স্বামীর মুক্তি আর দেখা হয়নি। শেষবারের মতো স্ত্রী ও শিশু সন্তানের
মরদেহ দেখতে হলো যশোর কারাগারের গেটে। পারিবারিক সিদ্ধান্তেই এমন
হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলো কারাগারের ফটক।
স্থানীয়রা
জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রেম করে বিয়ে করেন কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
তাদের সংসারে জন্ম নেয় সেহজাদ হোসেন নাজিফ নামে একটি পুত্রসন্তান। তবে গত ৫
আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সাদ্দাম।
এর মধ্যেই নয় মাস আগে জন্ম হয় তাদের একমাত্র সন্তানের।
জন্মের
পর থেকেই বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিল ছোট্ট নাজিফ। কারাগারে থাকা অবস্থায়
সন্তানকে একবার কোলে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে স্ত্রীকে একটি চিঠিও
লিখেছিলেন সাদ্দাম। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যায়। স্বামীকে
কারাগার থেকে মুক্ত করতে না পারার হতাশা ও মানসিক চাপে শেষ পর্যন্ত কানিজ
সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তার শিশুসন্তানের জীবন প্রদীপ নিভে যায় বলে ধারণা
স্বজনদের। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বাগেরহাটে নয় মাসের শিশু নাজিফ হোসেনকে
পানিতে চুবিয়ে হত্যার পর মা কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
করে পুলিশ।
শনিবার (২৪
জানুয়ারি) বিকেলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেষবারের মতো স্ত্রী ও
সন্তানের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় যশোর কারাগারের জেল গেটে, যাতে বন্দি স্বামী
অন্তত এক নজর দেখতে পারেন তার হারানো পরিবারকে। সেই দৃশ্য ঘিরে সেখানে এক
হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
নিহত
কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ভাই শুভ হাওলাদার বলেন, আমরা সাদ্দামের প্যারোলে
মুক্তির বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মৌখিকভাবে কথা বলেছিলাম।
তারা জানান, যেহেতু তিনি যশোর কারাগারে রয়েছেন, বিষয়টি যশোর জেলা প্রশাসনের
এখতিয়ার। সময় খুব কম থাকায় পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, শেষবারের মতো জেল গেটেই
মরদেহ দেখানো হবে।
এ বিষয়ে
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, সাদ্দাম যেহেতু যশোর কারাগারে
বন্দি, প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্ত যশোর জেলা প্রশাসনের এখতিয়ার। আমাদের
করার কিছু ছিল না।
এ বিষয়ে
যশোর জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন,
এই ঘটনায় প্যারোলে মুক্তির জন্য আমার কাছে বা জেলা প্রশাসনের কাছে কেউ কোনো
লিখিত আবেদন করেননি। আবেদন না থাকলে আইন অনুযায়ী আমাদের পক্ষে কোনো
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি মানবিকভাবে দুঃখজনক হলেও প্রশাসন
নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।
স্থানীয়
বাসিন্দা রিবা বেগমসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, হাসিখুশি একটা পরিবার এভাবে
শেষ হয়ে যাবে, এটা কেউ মানতে পারছে না। ঘটনাটি আত্মহত্যা না অন্য কিছু, তা
নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হওয়া দরকার।
বাগেরহাট
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান জানান, এ ঘটনায়
বাগেরহাট সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা ও একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড
করা হয়েছে। নিহতের বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে
হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ বাদী হয়ে করেছে অপমৃত্যুর মামলা।
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।