info@desherkhabor24.com

+8801821554477

বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৩

যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়ক: উন্নয়নের নামে পুকুর চুরি, থমকে গেছে ৬ লেন প্রকল্প

যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়ক: উন্নয়নের নামে পুকুর চুরি, থমকে গেছে ৬ লেন প্রকল্প
যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়ক: উন্নয়নের নামে পুকুর চুরি, থমকে গেছে ৬ লেন প্রকল্প

শাহারুল ইসলাম ফারদিন, যশোর

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সড়ক যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়ক। বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং নওয়াপাড়া নৌবন্দরের সঙ্গে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ নির্ভর করে এই পথের ওপর। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। দীর্ঘদিনের যানজট, দুর্ঘটনা ও সড়কের বেহাল অবস্থার প্রেক্ষাপটে এটিকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশার জায়গায় জন্ম নিয়েছে হতাশা, ক্ষোভ ও প্রশ্ন। উন্নয়নের নামে প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন উন্নয়নের আড়ালে পুকুর চুরির আরেক অধ্যায়।


ঝিনাইদহ শহরের বাইপাস সড়ক থেকে যশোর শহরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত প্রায় ৪৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করতে ‘উই কেয়ার’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। লক্ষ্য ছিল যানজট নিরসন, দুর্ঘটনা কমানো এবং বন্দরনির্ভর পণ্য পরিবহনকে দ্রুত ও নিরাপদ করা। প্রকল্পটি তিনটি লটে বিভক্ত করা হয়।

প্রথম লট ঝিনাইদহ বাইপাস থেকে কালীগঞ্জ উপজেলা মোড় পর্যন্ত। দ্বিতীয় লট কালীগঞ্জ উপজেলা মোড় থেকে বারোবাজার মান্দারতলা। তৃতীয় লট মান্দারতলা থেকে যশোরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত।


২০১৮ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথম লটের কাজ পায় ম্যাক্স গ্রুপ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটের কাজ দেওয়া হয় আব্দুল মোনেম লিমিটেডকে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।


প্রকল্পের শুরুতেই রাস্তার দুই পাশের শতবর্ষী রেইন্ট্রি, কড়ই, মেহগনিসহ মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, ঝিনাইদহ ও যশোরে অস্থায়ী প্রকল্প অফিস স্থাপন করা হয়। কাগজে-কলমে প্রস্তুতি এগোলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি।


প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৩০ মাস পার হলেও সামগ্রিক অগ্রগতি মাত্র ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটে কার্যত কোনো দৃশ্যমান কাজ নেই। অথচ কাজের প্রস্তুতির কথা বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৫০ কোটি টাকা অগ্রিম উত্তোলনের পরও সাইটে যন্ত্রপাতি, জনবল বা নির্মাণসামগ্রীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি।


এই পরিস্থিতিতে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক প্রায় ১,৯০০ কোটি টাকার অর্থছাড় স্থগিত করে লিখিতভাবে সড়ক বিভাগকে জানিয়ে দেয়। বাকি কাজ শেষ করতে হাতে আছে মাত্র কয়েক মাস। বাস্তবতা বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা অসম্ভব বলেই মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকে।


সড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ভারী যান চলাচলের চাপে সড়কের বেহাল অবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে, শুকনো মৌসুমে উড়ছে ধুলা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের অভিযোগ, আগে যে সড়কটি সংকীর্ণ হলেও চলাচলযোগ্য ছিল, এখন তা অনেক জায়গায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

যশোর সড়ক পরিবহন শ্রমিক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চু বলেন, উন্নয়ন কাজের নামে বছরের পর বছর ভোগান্তি বাড়ছে। প্রতিদিন দুর্ঘটনায় শ্রমিকরা আহত বা নিহত হচ্ছেন। তার ভাষায়, পরিকল্পনার চেয়ে অদক্ষ বাস্তবায়নই এখন বড় সমস্যা।


পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান লিটন জানান, গত তিন-চার বছরে এই সড়কে শতাধিক দুর্ঘটনায় কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন। সড়কের অবস্থা এমন যে বর্ষা মৌসুমে অনেক অংশে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরিস্থিতি না বদলালে পরিবহন চলাচল সীমিত করার কথা ভাবতে হবে বলে তিনি জানান।


আব্দুল মোনেম লিমিটেডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ দৃশ্যমান হয়নি। প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মঞ্জুর হাসান বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি কম হওয়ায় দাতা সংস্থা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে অর্থায়ন পুনর্বিন্যাস করে কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে।


তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি জমি অধিগ্রহণ জটিলতা থেকেই থাকে, তাহলে অগ্রিম অর্থ উত্তোলনের যৌক্তিকতা কোথায়। মাঠপর্যায়ে কাজ না থাকলে বিল পরিশোধ কীভাবে হলো, সেই প্রশ্নও উঠছে।

সড়ক বিভাগের অবস্থান


সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পে ধীরগতি এসেছে। তারা জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক অগ্রগতিতে অসন্তোষ জানিয়ে অর্থছাড় বন্ধ করেছে। তবে বর্ষার আগে অন্তত জরুরি সংস্কার করে সড়কটি যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হবে।


তাদের মতে, প্রকল্পটি এখনো বাতিল হয়নি, আলোচনা চলছে। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।


যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়ক শুধু আঞ্চলিক যোগাযোগপথ নয়, এটি দেশের রপ্তানি-আমদানির বড় একটি করিডর। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশের বৃহত্তম স্থলবাণিজ্য পরিচালিত হয়। ভোমরা, মোংলা ও নওয়াপাড়ার পণ্য পরিবহনেও এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সড়ক উন্নয়ন থমকে গেলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। এতে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থাহীনতা তৈরি করে। বিশেষ করে দাতা সংস্থার অর্থছাড় স্থগিত হওয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


৩০ মাসে ২ শতাংশ অগ্রগতি, অগ্রিম অর্থ উত্তোলন, অর্থছাড় স্থগিত সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহির ঘাটতি স্পষ্ট বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করতে হবে। শুধু আশ্বাসে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।


প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন কয়েকটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। দাতা সংস্থার সঙ্গে নতুন করে সমঝোতা হবে কিনা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন হবে কিনা, কিংবা প্রকল্প পুনঃটেন্ডার করা হবে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।


তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, যশোর–ঝিনাইদহ মহাসড়কের উন্নয়ন আর বিলম্ব সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই। প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝা বইছে সাধারণ মানুষ। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ না নিলে “পুকুর চুরি”র অভিযোগ আরও জোরালো হবে।


এই সড়ক শুধু ইট-বালুর কাঠামো নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণরেখা। সেই প্রাণরেখা যদি বছরের পর বছর উন্নয়নের নামে ক্ষতবিক্ষত থাকে, তাহলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই কারও। এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, কঠোর তদারকি এবং দৃশ্যমান কাজ। নইলে ৬ লেনের স্বপ্ন কাগজেই রয়ে

যাবে, আর বাস্তবে বাড়বে মানুষের দুর্ভোগ।