মাহবুব পিয়াল,ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
ফরিদপুরের জেলা সদরের মাধবদিয়া ইউনিয়নের কালীতলা এলাকায় মা ও পাঁচ বছরের শিশু কন্যাকে হত্যার পর মাটি চাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখার চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্কের জেরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বকারটিলা এলাকার বাসিন্দা মো. উজ্জল খানকে (৩৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ রবিবার দুপুরে কোতয়ালী থানা সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান, ডিআইও-১ ইন্সপেক্টর মো. মোশাররফ হোসেন এবং পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ বিশ্বাস
পুলিশ জানায়, নিহত জাহানারা আক্তার (৩০) রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দক্ষিণ দৌলতদিয়া ইউনিয়নের কর্নসোনা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আমজাদ শেখের স্ত্রী। তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে সামিয়া আক্তারকে নিয়ে গত ৪ মে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ ছিলেন। পরে গত ১৪ মে বিকেলে ফরিদপুর সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের কালীতলা এলাকার একটি পুকুরপাড় সংলগ্ন স্থান থেকে মা ও মেয়ের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহত জাহানারার বাবা মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার নারান তেওতা গ্রামের বাসিন্দা লালন মোল্লা বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার পান উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবুল বাসার মোল্লা।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উজ্জল খানকে শনাক্ত করে। শনিবার দুপুরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বকারটিলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মা ও মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
ফরিদপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম জানান, প্রায় তিন বছর আগে ঢাকার আমিনবাজার এলাকার একটি ইটভাটায় কাজ করার সময় জাহানারার সঙ্গে উজ্জলের পরিচয় হয়। উভয়ের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সেই সম্পর্ক পরকীয়ায় রূপ নেয়। বিষয়টি ইটভাটায় জানাজানি হয়ে গেলে প্রথমে উজ্জল এবং পরে জাহানারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তবে বাড়িতে ফেরার পরও তাদের মধ্যে গোপন যোগাযোগ চলতে থাকে।
তিনি জানান, উজ্জল জাহানারাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সময় গড়ালেও তিনি বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ নিয়ে জাহানারা চাপ দিতে থাকেন। গত ৪ মে তিনি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে উজ্জলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে উজ্জলের কথামতো ফরিদপুর সদরের চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের কালীতলা এলাকার একটি নির্জন ছাপড়া ঘরে যান।
সেখানে বিয়ে নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। জাহানারা সেদিনই তাকে বিয়ে না করলে উজ্জলের বাড়িতে গিয়ে উঠবেন বলে হুমকি দেন। এতে উজ্জল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
পুলিশ জানায়, ওইদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে উজ্জল প্রথমে জাহানারার বুকে আঘাত করেন। পরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এ সময় পাশে থাকা শিশু সামিয়া চিৎকার শুরু করলে তাকেও গলা টিপে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর উজ্জল নিজ বাড়ি থেকে কোদাল এনে ঘটনাস্থলের পাশে পৃথক দুটি গর্ত খুঁড়ে মা ও মেয়ের মরদেহ মাটি চাপা দেন। পরে ঘটনাস্থল ঢেকে রাখতে কলাগাছ ও মাটি ব্যবহার করেন যাতে কেউ সহজে বুঝতে না পারে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আবুল বাসার মোল্লা জানান, উজ্জলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের ব্যবহৃত বোরকা, ওড়না, নেকাব, শিশু সামিয়ার পোশাক, একটি মালা, আসামির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোদাল ও একটি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুইটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, গ্রেপ্তার উজ্জল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে জবানবন্দি না দিলে তাকে রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের আবেদন করা হবে।