ঢাবি প্রতিনিধি:
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘জুলাই সনদ ও সংস্কার:
নতুন বাংলাদেশ নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদ’ শীর্ষক সংস্কার আলাপ অনুষ্ঠিত
হয়েছে। আজ বুধবার (৯ এপ্রিল ২০২৬) বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রাঙ্গণে এ সংস্কার আলাপের দ্বিতীয় পর্ব
অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
অনুষ্ঠানে
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল
হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগর সাবেক
চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সাধারণ
সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র
আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভাপতি অধ্যাপক ড.
শামীমা তাসনিম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর,
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার ও দৈনিক সমকালের
বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদ প্রমুখ।
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড.
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সংবিধান শুধু আইনের ধারায় সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি
“স্পিরিট” বা মূল উদ্দেশ্য রয়েছে, যা উপেক্ষা করলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত
হয়—যেমন অতীতে বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। গণভোট ও সংবিধান সংশোধন বিষয়ে বিএনপির
দ্বৈত বক্তব্য সমর্থকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। জুলাই অভ্যুত্থান
একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তা ও সংবিধানের আশা তৈরি করেছে; কিন্তু সেটিকে
অস্বীকার করে শুধু নির্বাচনের কথা বলা অসঙ্গত ও পরস্পরবিরোধী। ক্ষমতার
ভারসাম্য নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত আপার হাউস, কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিল ও
অন্যান্য সংস্কার উদ্যোগগুলো বিএনপি প্রত্যাখ্যান করছে। এই অবস্থান
গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে এবং জনগণের প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক।’
সম্মিলিত
নারী প্রয়াসের সভাপতি অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিম বলেন, ‘রাজনীতির অর্থ আজ
বিকৃত হলেও জুলাই অভ্যুত্থান নতুন প্রজন্মকে এর ইতিবাচক অর্থ শিখিয়েছে।
বিএনপি নেতাদের ৭২-এর সংবিধান নিয়ে পূর্বের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থানের
মধ্যে বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের হতাশ করেছে। সংবিধান
“সংশোধন” নয়, বরং “সংস্কার” প্রয়োজন। কারণ ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো জোড়াতালি
দিয়ে টেকসই করা সম্ভব নয়। উচ্চকক্ষ বাতিল, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য না
থাকা, মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা—একটি ‘ফ্যাসিস্ট
চক্র’ তৈরি করছে। যার মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা চেষ্টা চলছে।এই
দুষ্টচক্র ভাঙার একমাত্র পথ হলো ঐক্য; জুলাইয়ের মতো ধর্ম, লিঙ্গ ও দলমতের
ঊর্ধ্বে উঠে জনগণ একত্রিত না হলে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশ
খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান
আমার রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও আমি
এই চেতনা ধারণ করে এগোতে চাই। লাহোর প্রস্তাবের অপূর্ণতা যেমন ১৯৭১-এ
সংশোধিত হয়েছিল, তেমনি ৭২-এর সংবিধান ৭১-এর চেতনাকে পুরোপুরি ধারণ করতে
পারেনি এবং ২০২৪-এর অভ্যুত্থান সেই বিচ্যুতি সংশোধনের একটি নতুন সুযোগ।
২০২৪-এর আন্দোলন ৭১-এর সেই মূল চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই হয়েছে। অতীতে
বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত শুধু বিএনপি নয়, বরং তাদের সমর্থক বৃহত্তর
রাজনৈতিক শক্তিকেও দিতে হয়েছে। বিএনপিকে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের যে
রায় অর্থাৎ গণভোট বাস্তবায়নের আহবান জানাচ্ছি।’
দৈনিক সমকালের বিশেষ
প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মূল সমস্যা দুর্নীতি বা
অবকাঠামো নয়, বরং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া; ক্ষমতায় গেলে
কেউ তা ছাড়তে চায় না এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এই কারণে
বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়, যা গণতন্ত্রকে
দুর্বল করে। জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও একটি
নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা—যেখানে স্বাধীন বিচার বিভাগ,
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকবে।
সংবিধানকে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা রোধে আপার হাউস ও
চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। গণভোটের মাধ্যমে
জনগণই এই আদেশকে বৈধতা দিয়েছে, তাই এটি অস্বীকার করা অনর্থক।’
গণভোট
বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘৯০-এর
গণঅভ্যুত্থানের সময় যেমন বড় প্রত্যাশা ছিল, তেমনি এখনো রয়েছে; তবে একসময়
ছাত্ররাজনীতি নেতিবাচক মনে হলেও ২০২৪ সালের আন্দোলন প্রমাণ করেছে, তরুণরাই
রাষ্ট্র পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো অনেক
ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলেও ছাত্রসমাজই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের বৈধতা এসেছে গণভোট থেকে, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ
সমর্থন দিয়ে এটিকে নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিয়েছে। তাই গণরায়ের উপরে আর
কোনো বিতর্ক থাকা উচিত নয়। অসংখ্য অধ্যাদেশের মধ্যে বিচার বিভাগের
স্বাধীনতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া
উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের ভারসাম্য নষ্ট করে বিচার বিভাগকে
নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক ইঙ্গিত দেয়।’
জাতীয়
নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সংবিধান ও
সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাদের জানিয়ে দিতে
চাই, সংসদ নয়, জনগণই প্রকৃত সার্বভৌম এবং সংসদ সংবিধানের অধীনেই ক্ষমতা
প্রয়োগ করে। অনেক নেতা অতীতে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও এখন তা অস্বীকার
করছেন, যা রাজনৈতিক দ্বিচারিতার প্রকাশ।’ বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা,
সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পারিবারিকীকরণের
প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সেই সঙ্গে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও
গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট উপেক্ষা করলে অতীতের মতোই গণআন্দোলন আবার ফিরে আসতে
পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সাধারণ
সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতার
ঘোষণাপত্র ছিল জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন, যেখানে সাম্য, মানবিক
মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু
১৯৭২-এর সংবিধান সেই মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভিন্ন আদর্শ চাপিয়ে দেয়।
ইতিহাসে বারবার রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই চেতনার সাথে বেইমানি করেছে এবং একইভাবে
বর্তমানেও গণভোটের ম্যান্ডেটকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।
অতীতের মতোই বর্তমান রাজনীতিতেও হীনমন্যতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব থেকে
সত্য ও জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে
ব্যবহার করে জনগণের আকাঙ্ক্ষা দমন করা হলে তা নতুন সংকট তৈরি করবে। ২০২৪-এর
গণঅভ্যুত্থান কোনো শেষ নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া; যদি রাজনৈতিক
নেতৃত্ব সংশোধিত পথে না আসে, তবে তরুণ সমাজ আবারও আন্দোলনে নামবে।’
বাংলাদেশ
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘বাংলাদেশের
পূর্ববর্তী গণভোটগুলোতে প্রশ্ন ছিল অস্পষ্ট, অথচ সাম্প্রতিক গণভোটে
নির্দিষ্ট প্রস্তাবসহ স্পষ্ট প্রশ্ন ছিল এবং এতে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার
অংশগ্রহণ করে প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন দিয়েছে—যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি
গ্রহণযোগ্য। তাই জনগণ প্রশ্ন বুঝেনি—বিএনপি নেতাদের এমন দাবি ভিত্তিহীন।
সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়; বরং সংবিধান ও জনগণই সর্বোচ্চ, যা
সুপ্রিম কোর্টের রায়েও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
খর্ব করে সংসদের মাধ্যমে আইন পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক,
কারণ এটি বিচার বিভাগ ও সংসদের মধ্যে সংঘাত তৈরি করছে। ইতোমধ্যে কার্যকর
কোনো আইন বা প্রতিষ্ঠান হঠাৎ বাতিল করে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়; বরং
আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত ছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নষ্ট করা
গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি এবং একমাত্র জনগণের মতামত—বিশেষ করে গণভোট—এই
সংকটের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারে।’
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি
সাদিক কায়েম বলেন, ‘ডাকসুর উদ্যোগে আমরা সংস্কার সংলাপ শুরু করেছি। আজকের
আয়োজনটি অংশগ্রহণমূলক করার চেষ্টা করেছি, পক্ষে-বিপক্ষে ডিবেটের মাধ্যমে
শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে পারবে। কিন্তু বিএনপিপন্থী অনেককে আহবান করেও
তারা সাড়া দেয়নি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সকলকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা।
আমরা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের অনুরোধ করছি—নিজেদের সংশোধন করুন।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে সুযোগ এসেছে, সেটিকে গ্রহণ করুন। বর্তমান বিএনপি
আবার তাদের শত্রুর প্রভাব ও বিদেশী প্রেসক্রিপশনের রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে,
যা দেশের জন্য হতাশাজনক। অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র
সংস্কারের পথে বাধা দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের
নতুন পথপ্রদর্শন করেছে। এটি ছাত্র-তরুণ প্রজন্মের সংগ্রাম ও ত্যাগের ফল।
গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। বিএনপি এবং অন্যান্য
দলগুলোকে আমরা অনুরোধ করব—শহীদদের রক্তের দাগ যে মাটিতে লেগেছে, তার সাথে
প্রতারণা করবেন না। জনতার ম্যান্ডেট মেনে সংস্কার বাস্তবায়ন করুন, স্বাধীন
প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র কাঠামো শক্তিশালী করুন। আমরা চাই নতুন বাংলাদেশ
বিনির্মাণ হোক। ইনসাফমূলক, শক্তিশালী অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির
পুনর্গঠন হোক। এই লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব,
প্রয়োজনে নিজেদের জীবন উৎসর্গের জন্যও প্রস্তুত রয়েছি, তবুও জুলাইয়ের
সঙ্গে প্রতারণা হতে দেব না।’
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান
উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ছাত্র পরিবহন
সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে
মোহাম্মদ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও
পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ, মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক
মো. জাকারিয়া সহ ঢাবির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ।