মাহবুব পিয়াল,ফরিদপুর:
ফরিদপুরের সালথা এবং বোয়ালমারী উপজেলার কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও একটি বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হয়েছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া এবং বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সরেজমিনে জানা গেছে, সালথার খারদিয়া ও বোয়ালমারীর পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ময়েনদিয়া বাজার এলাকাটির সবচেয়ে বড় বাজার। এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে সালথার খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুর ছেলে মো. জিহাদ মিয়া ও টুলু মিয়ার সঙ্গে পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ময়েনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের বিরোধ প্রায় এক যুগ ধরে চলে আসছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বরকে। বাজার সংলগ্ন ময়েনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মান্নান মাতুব্বর ও তাঁর অনুসারীরা বাজারটি পরিচালনা করতেন। এ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে জিহাদ মিয়া ও তাঁর পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যান।
এলাকা সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জিহাদ মিয়া এলাকায় ফিরে এসে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সজিব মিয়ার নেতৃত্বে ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে মান্নান চেয়ারম্যানের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং তিনি পরিবারসহ এলাকা ছাড়েন।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মান্নান চেয়ারম্যান বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেন। দেশব্যাপী বিএনপির বিজয়ের পর তিনি বাড়ি ফিরে এলে এলাকায় ফের উত্তেজনা শুরু হয়।
শনিবার সকালে জিহাদ মিয়া ও টুলু মিয়ার সমর্থকদের সঙ্গে আব্দুল মান্নানের সমর্থকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। খারদিয়া, নটখোলা, ময়েনদিয়া ও পরমেশ্বরদী এলাকার হাজারো মানুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুপুর পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে।
এ সময় অন্তত ১৫টি বসতঘর ভাঙচুর এবং দুটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আহতরা ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সালথা আর্মি ক্যাম্প সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের পরদিন থেকেই এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। শনিবার সকালে সংঘর্ষ শুরু হলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ফরিদপুর সহকারী পুলিশ সুপার (সালথা-নগরকান্দা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সংঘর্ষের পর পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে।