নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার মুক্তিপন আদায়

কে এম, রাশেদ কামাল,মাদারীপুর প্রতিনিধি:
বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের দেশ ইটালি নেয়ার কথা বলে প্রথমে নেয়া হয় লিবিয়া। সেখানেই আটকে রেখে চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন। কখনও কখনও সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারন করে পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। আবার কখনও ভিডিও কলে দেখানো হয় সেই নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য। শুধু মুক্তিপনের টাকা আদায়ের জন্যই নির্যাতন করা হয়। এমন একটি চক্রে সন্ধান পাওয়া গেছে মাদারীপুরে।

মানবপাচারের শিকার এমন একাধিক লোকের সাথে কথা বলে জানা গেছে লোমহর্ষক তথ্য। এই চক্রটি প্রথমে অল্প খরচে লিবিয়া হয়ে ইটালি যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এরপর লিবিয়া নেয়ার পর তাদের লিবিয়ার দুর্গম কোন স্থানে নিয়ে আটকে রাখা হয়। চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারন করে পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। আবার কখনও কখনও ভিডিও কলে স্বজনদের দেখানো হয় নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতনের মূল হোতা মাফিয়া শরীফ। মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের নতুন মাঠ গ্রামের সাকা মাতুব্বরের মেয়ে সুমিকে বিয়ে করেন শরীফ। সুমিসহ একাধিক দালাল মাদারীপুর থেকে লোক সংগ্রহ করে লিবিয়াতে পাঠায়। লিবিয়াতে পৌছানোর পরই চালানো হয় নির্যাতন। লিবিয়াতে যারা নির্যাতন করে তাদেরই একজন আজিজুল ইসলাম নির্ঝর। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্যাতন চালানো আজিজুল হক নির্ঝর (২৭) মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের চরনাচনা গ্রামের আবুল কালাম হাওলাদারের ছেলে। তিনি লিবিয়ায় পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জোয়ারা ক্যাম্পের মাফিয়া শরীফ হোসেনের সহযোগী। তার দায়িত্ব ছিলো বন্দিশালার বন্দিদের নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামের রাকিব ফরাজী নামে এক ভুক্তভোগী বলেন,‘ শরীফের ক্যাম্পের আমি বন্দি ছিলাম। ক্যাম্পে থাকার দুই মাসের মধ্যে নির্ঝরের নির্যাতনের শিকার হয়ে ২ টি ছেলে মারা গিয়েছে। আমাকে মারতে মারতে অজ্ঞান বানিয়ে ফেলেছিল। জ্ঞান ফেরার পর আবারো মেরেছে। মারার ফলে আমার চোখের মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিলো।’ নির্যাতনের শিকার আরেক ভুক্তভোগী মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বনি আমিন। তাকে ক্যাম্পে আটকে রেখে মুুক্তিপনের জন্য কয়েক দফায় নির্যাতন চালানো হয়। পরে শরীফের স্ত্রী সুমি এজেন্ট ব্যাংকিং নম্বরে ২০ লক্ষ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। শুধু বনি আমিন আর রাকিব ফরাজী নয়। এমন হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে মুক্তিপন আদায় করছে এই চক্রটি।

মুন্সিগঞ্জ জেলার মোল্লাকান্দি গ্রামের সেলিম শেখের ছেলে জাহাঙ্গীর শেখও(২৭) নির্যাতন করা হয়। লিবিয়ার মাফিয়া শরীফের বন্দিশালায় থাকাকালীন আজিজুল হক নির্ঝরের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন লিবিয়ায়। সেখানে গিয়ে মাফিয়ার খপ্পরে পড়ে বন্দিশালায় এমন বিভীষিকাময় জীবন কেটেছে তার। পরে টাকার বিনিময়ে লিবিয়ার বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে হাইতেম নামের এক দালালের মাধ্যমে ২০২২ সালের ৬ এপ্রিল পৌঁছেছেন ইতালিতে। দীর্ঘদিন ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর শেখ বলেন,‘নির্ঝর এতোটাই নির্দয় ছিলো যে, ও কাউকেই ছাড়তো না। বাপ-চাচার বয়সী লোকজন কেও টাকার জন্য প্রচুর মারধর করতো। গলায় পাড়া দিয়ে, দাড়ি টেনে কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন চালাতো। বন্দিশালায় জায়গায় জায়গায় রক্ত লেগে ছোপ ছোপ দাঁগ হয়ে গিয়েছিলো। আমাকে করা নির্যাতন দেখে বাবা স্ট্রোক করে মারা গিয়েছে। পরিবারের লোকজন আমার কাছে বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছিলো। পরে ইতালি গিয়ে আরেক দেশী ভাইয়ের থেকে জানতে পেরেছি। আমরা হয়তো ভুল করে এ পথে এসেছি। প্রশাসনের কাছে আমরা এর বিচার চাই।’

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে ফিরেছে অভিযুক্ত আজিজুল হক নির্ঝর। মুক্তিপনের দাবীতে নির্যাতের ব্যাপারে তিনি বলেন,‘আমি নিজেও কাজের সন্ধানে লিবিয়া গিয়েছিলাম। আমাকে ইতালি যাওয়ার পথে মাফিয়ারা বন্দি করে শরীফের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্পের বন্দিরা সবাই অনেক কান্নাকাটি আর চেচামেচি করতো। আমি ভাষা জানতাম বলে শরীফ আমাকে ক্যাম্পের দায়িত্ব দিয়েছিল সবাইকে চুপচাপ রাখার। সে সময় অনেককেই গালাগালি করেছি তাই হয়ত ক্ষব্ধ হয়ে আমার নামে অভিযোগ দিতে পারে। আমি কারো কাছ থেকে মুক্তিপর আদায় করিনি। টাকা পয়সার ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। আমি শুনেছি ওখানে সাড়ে ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। আমি কারো কাছ থেকে কোনো টাকা পয়সা নেইনি। আমি শুধু সবাইকে চুপচাপ রাখার জন্য শাসন করেছি। আমি ক্যাম্পে ভালো সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য এই দায়িত্ব পালন করেছি। কেউ যদি আমার নামে অভিযোগ করে থাকে সেটা সত্য না।’

এব্যপারে জানতে লিবিয়াতে অবস্থানরত মাফিয়া শরীফের হোয়াটস আপ নম্বরে একাধিক বার ফোন দিলেও ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস করলেও জবাব দেননি। তার স্ত্রী সুমি আক্তার ও তার পরিবার কয়েক মাস যাবত এলাকা ছাড়া। তাদেরকেও বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি।

এবিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন,‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। মানবপাচার রোধে আমরা বদ্ধপরিকর। মানুষকে কোথাও আটকে রেখে জিম্মি করে টাকা পয়সা নেয়া মেনে নেওয়া যায়না। তাই আমরা আইনের মধ্যে থেকেই মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করছি, অনেককে আমরা গ্রেপ্তারও করেছি। আর সকল অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলা, তারা যেনো অবৈধ পথে তাদের সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *