মনপুরায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের নৌ অ্যাম্বুলেন্স অকেজো হয়ে পুকুরে

সাব্বির আলম বাবু, ভোলাঃ
ভোলার দুর্গম দ্বীপ উপজেলা মনপুরার বাসিন্দাদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দিতে চার বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অ্যাম্বুলেন্স এখন ওই উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের একটি পুকুরে পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। সেখানে একটি তেঁতুলগাছে বাঁধা রয়েছে সেটি। অথচ এটি দিয়ে গত করোনাকালীনও রোগী বহন করা হয়েছিল।

জানা গেছে, মনপুরার মতো চরফ্যাশন উপজেলায়ও নৌ অ্যাম্বুলেন্স পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তাল মেঘনায় এই অ্যাম্বুলেন্স চালানো সম্ভব নয়। ধীরগতি ও চালক নেই। জ্বালানিও বেশি লাগে। মনপুরায় দেখা গেছে, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি মনপুরা উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চরযতিন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরের মধ্যে তেঁতুলগাছে বেঁধে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় নৌ অ্যাম্বুলেন্সের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। নৌ অ্যাম্বুলেন্সের চালক আ. খালেক বলেন, ‘চার বছর আগে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি মনপুরায় আনার পর থেকে আমি এটি দিয়ে রোগী এই উপজেলা থেকে তজুমদ্দিন ও ভোলা সদর উপজেলায় আনা-নেওয়া করেছি। কিন্তু ছয় মাস আগে আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই থেকে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এখানেই বাঁধা রয়েছে।’

জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রশিদের প্রচেষ্টায় নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সেখানে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার’ (সি বি এইচ সি) প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কেনা এই অ্যাম্বুলেন্স গুলোর একেকটির দাম ২৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা সদরের সঙ্গে নৌপথই মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে জেলা সদরে আসতে হলে তাঁদের লঞ্চ, স্পিডবোট কিংবা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে আসতে হয়।প্রসূতিদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ছয় মাস ধরে কেন অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির ধীরগতি। মেঘনার মতো উত্তাল নদীতে এই অ্যাম্বুলেন্স চালানো সম্ভব নয়। এ ছাড়া চালক নেই। জ্বালানিও বেশি লাগে। কোস্টগার্ড যে নৌ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে, সে ধরনের অ্যাম্বুলেন্স দরকার।

সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রশিদ বলেন, ‘আমি ২০১৮ সালে মনপুরায় থাকাকালীন ৩ নম্বর সতর্কসংকেতের মধ্যেও ওই নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে রোগী নিয়ে মনপুরা থেকে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় গিয়েছি। এটি ধীরগতি হলে আমি তখন কীভাবে গেলাম?’ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সভাপতি শেলিনা আকতার চৌধুরী বলেন, উপজেলার দুর্গম এলাকায় বর্ষাকালে প্রসূতিদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সটির যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, চালক না থাকায় এবং সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে এটি হয়তো তেঁতুলগাছে বাঁধা রয়েছে। এ বিষয়ে বারবার কর্তৃপক্ষকে বলেও লাভ হয়নি।

সিভিল সার্জন কে এম শফিকুজ্জামান বলেন, চালক ছাড়াই ভোলার মনপুরা, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলায় চারটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়। ধীরগতি সম্পন্ন নৌ অ্যাম্বুলেন্স গুলো অল্প পানিতে চলতে পারে না। না চলার কারণে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে চার মাস আগে এসে তদন্ত করা হয়। বলা হয়, প্রতিটা নৌ অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করতে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *