ফরিদপুর জেলায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করেছে নন্দিতা সুরক্ষা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক জনাব অতুল সরকার এর নির্দেশনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসের ট্রাস্ট এর অর্থায়নে নন্দিতা সুরক্ষা ফরিদপুর জেলায় অবস্থানরত হিজড়া জনগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করেছে। এই পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে জেলা প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে নন্দিতা সুরক্ষা কাজ করেছে মাঠ পর্যায়ে। উল্লেখ্য যে ফরিদপুর সহ পার্শ্ববর্তী জেলায় ইতিপূর্বে এধরণের তালিকা প্রস্তুক করা হয়নি। হিজড়া জনগোষ্ঠীর তথ্য তালিকাটি তুলে ধরা হলো:

‘হিজড়া‘ শব্দটি একটি উর্দু শব্দ, যা সেমেটিক আরবি ধাতুমূল হিজর থেকে ‘গোত্র হতে পরিত্যাক্ত‘ অর্থে এসেছে। এবং পরবর্তীতে তা হিন্দি ভাষায় বিদেশী শব্দ হিসেবে প্রবেশ করেছে। শব্দটির ভারতীয় ব্যবহারকে প্রথাগতভাবে ইংরেজিতে “ইউনাক” (Eunuch, অর্থঃ খোজা) বা “হারমাফ্রোডাইট” (hermaphrodite, অর্থঃ উভলিঙ্গ) হিসেবে অনুবাদ করা হয়, যেখানে “পুং জননাঙ্গের অনুপস্থিতি হল উক্ত সংজ্ঞার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্ত।“ বিশ্বজুড়েই লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী অন্যতম। নিজেদের আত্ম–পরিচয় প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও নিপীড়ন সহ্য করতে হয় লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষদের। রাষ্ট্রীয় ‘হিজড়া লিঙ্গ’ স্বীকৃতি, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রে সতন্ত্র পরিচয় প্রদানের সুযোগ তৈরির মতো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সূচকে এই জনগোষ্ঠী এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। দেশের সর্বসাধারণের এখনো হিজড়া ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। হিজড়া কি বা কারা? হিজড়া কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় নয়, এটি মূলত একটি কার্লচার/সংস্কৃতি। সমাজের ধরে বেঁধে দেয়া নারী বা পুরুষ পরিচয়ের বাইরেও রয়েছে, রূপান্তরিত বা ট্রান্সজেন্ডার নারী–পুরুষ, জৈবিক দিক থেকে বৈচিত্র্যময় নারী–পুরুষ, ইন্টারসেক্স বা আন্তঃলিঙ্গের ব্যক্তিসহ আরো কিছু লৈঙ্গিক পরিচয়ের মানুষ। একজন পুরুষ যখন লৈঙ্গিক অতৃপ্তি বা অস্বস্তির কারণে একজন নারীর জেন্ডার ভূমিকায় স্বস্তিবোধ করেন, তখন তারপরিচয় হয় ট্রান্সজেন্ডার নারী। একই ভাবে একজন নারী যখন পুরুষের জেন্ডার ভূমিকায় স্বস্তিবোধ করেন এবং সেই মোতাবেক নিজেকে পরিবর্তন করেন, তখন তিনি হয়ে উঠেন ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ। হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার শব্দগুলোর সাথে আমরা অনেকটা পরিচিত হলেও ‘ইন্টারসেক্স’ শব্দটি অনেকের কাছেই অজানা। গর্ভাবস্থায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারনে জন্মের সময় কিছু শিশুর লিঙ্গ নির্ধারনে সমস্যা দেখা দেয়। লিঙ্গ দেখে বোঝা যায় না যে, শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে। আর এই শিশুদের বলা হয় ইন্টারসেক্স (Intersex) বা আন্তঃলিঙ্গ। জন্মগতভাবে ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের জননাঙ্গ নারী বা পুরুষের থেকে আলাদা। এদের যৌনাঙ্গগুলি পুরুষ বা নারী হিসাবে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। আমাদের অধিকাংশের ধারণা, হিজড়া সংস্কৃতি মাত্রই শারীরিকভাবে অর্ধ নারী বা পুরুষ অথবা ইন্টারসেক্স। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়, হিজড়া সংস্কৃতিতে এমন অনেকে আছেন যারা শারীরিকভাবে পুরুষ হলেও মানসিকভাবে নারী অথবা শারীরিকভাবে নারী হলেও মানসিকভাবে পুরুষ। গতানুগতিকভাবে একে দেয়া লিঙ্গের চিত্রের বাইরে বৈচিত্র্যময় লিঙ্গের মানুষগুলিই দলবদ্ধ হয়ে হিজড়া সংস্কৃতিতে বসবাস করেন। পরিবার ও সমাজের বঞ্চনা, অত্যাচার, বুলিং এ জর্জরিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজের প্রকৃত জেন্ডার ভূমিকায় নিজেকে সাবলীলভাবে পরিচিত করতে হিজড়া দলে নাম লেখান বৈচিত্র্যময় নারী– পুরুষেরা। হিজড়াগুরুদের ডেরায় শুরু হয় তাদের এক নতুন জীবন, যেখানে বুলিং এর কারন তাদের আচরণ, পোশাক, সাজ অথবা যৌন চাহিদার ভিন্নতা নয়। তবে এমন অনেক বৈচিত্র্যময় নারী–পুরুষেরা আছেন যারা হিজড়া দলের অন্তর্ভুক্ত হননি, একা বা পরিবারের সাথেই জীবন–যাপন করছেন। কিন্তু বিভ্রান্তিকর হলেও সত্যি যে, জেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অসচেতনতা এবং বুলিং বা বডি সেমিং সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে প্রতিমুহূর্তে একদম কৈশোর থেকেই এই বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিরা পরিবার–পরিজনের কাছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেসহ গোটা সমাজের মুখেই হিজড়া, মাইগ্যা, হাফলেডিস ইত্যাদি নানা রকম কটুবাক্য শুনে শুনে ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হন। সমাজব্যবস্থার প্রতি তীব্র ঘৃনা নিয়ে বড় হতে হতে কেউ কেউ হাল ছেড়ে চলে যায় কোনো হিজড়া গুরুর ডেরায়, কেউ বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ আর কেউবা থেকে যায় পরিবারেই। ফরিদপুর এর হিজরা জনগোষ্ঠীর অবস্থা : বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার যেমন ঢাকা, রাজশাহী, জামালপুর, যশোরের হিজড়া বা লিঙ্গবৈচিত্র‍্যময় জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হলেও ফরিদপুরের চিত্র বেশ ভিন্ন। ফরিদপুর জেলার ৯ টি উপজেলায় প্রায় শতাধিক হিজড়া ও লিঙ্গবৈচিত্র‍্যময় জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের থেকে শুরু করে তাদের জন্য প্রদানকৃত সেবাসমূহ সম্পর্কেও অবগত নন। এমনকি হিজড়া ও লিঙ্গবৈচিত্র‍্যময় জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও যে সমাজের বাকি দশজন মানুষের মত বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে সেটিও তাদের ভাবনার বাইরে। ফলস্বরূপ কয়েকজন ব্যাতিত এরা সকলেই হিজরাগীরী পেশায় নিয়োজিত। তবে এদের মাঝে কয়েকজন হিজড়া পরিচয় নিয়েই ব্যবসা ও চাকুরী করছেন। মিলেছে কয়েকজন এসএসসি ও এইসএসসি পাশ এমনকি অনার্স পড়ুয়া বৈচিত্র্যময় নারীর তথ্য। তাদের স্বপ্ন ছিলো লেখাপড়া শেষে করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু শারীরিক বৈচিত্র্য নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে এখন নিজেদের শারীরিক বিকলঙ্গ ভেবে সকল স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে নেমেছেন পথে। কিছু অদ্ভুত তথ্যও উঠে এসেছে তালিকায়, যেমন একই পরিবারের আপন দুবোন হিজড়াগীরী পেশায় আছেন একই গুরু মায়ের ডেরায় (হিজড়াদের বাসস্থান)। আছেন আপন চাচা ভাস্তেও। হিজরা জনগোষ্ঠীর যেসকল সদস্যরা তুলনামূলক অনুন্নত এলাকাগুলিতে বসবাস করেন তারা নানারকম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন, যেমন তারা যৌনাঙ্গ বা স্তন ট্রান্সপ্লান্টের জন্য অনিরাপদ সেবা গ্রহণ করেন যা কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ব্লাস্ট, বন্ধু, লাইট হাউজ সহ যে সকল প্রতিষ্ঠান হিজড়া ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে বিভিন্ন সেবা প্রদান করে থাকে সে বিষয়ে অনেকের মধ্যে সাধারণ ধারনাও নেই। অসচেতনতা ও না জানাগুলো থেকেই যতটুকু সেবা বা গ্রহনযোগ্যতা আছে সেটা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। হিজড়াগীরী পেশায় গুরুমা এর ছত্রছায়ায় থেকেও অনেক হিজড়া এই পেশা ছেড়ে সম্মানজনক কাজ করতে চান, কিন্তু বাঁধ সাধে সমাজ ব্যাবস্থা কেননা নানা কারনে চাইলেই একজন হিজড়াকে কেউ কাজে ডাকবে না। অন্যদিকে তারা কি ধরনের কাজ করতে চান জানতে চাইলে তারা জানান, হিজড়ারা দীর্ঘ সময় ধরে পথে ঘাটে হেটে, হাত তালি দিয়ে পয়সা উপার্জন করেছে, কিন্তু তাদের জন্য যে সকল কাজের ব্যবস্থা থাকে সেগুলো ঘর কেন্দ্রিক, ফলে তারা মানসিকভাবে এইসকল কজের সাথে যুক্ত হতে পারে না। ফরিদপুর সদর উপজেলার শাপলা হিজড়া বলেন, আমাদের জন্য খামার করা, বাগানী অথবা প্রহর এরকম কাজ করা সহজ, সারাজীবন রাস্তায় রাস্তায় কালেকশন করে কাটিয়েছি এখন, সেলাই মেশিনে বসার মতোন মন মানসিকতা নেই। অন্যদিকে, কুমকুম (ছদ্মনাম) হিজড়া বলেন, আমাদের জন্য বিউটি পার্লারের প্রশিক্ষণের সুযোগ আসে, কিন্তু আমরা পার্লার খুলে বসলে কতজন ক্রেতা আমাদের কাছে আসবেন সেটা কেউ ভেবে দেখেন না, রাস্তা ঘাটে হিজড়া দেখেই সবাই ভয় পায় সেখানে টাকা দিয়ে আমাদের সেবা গ্রহণ স্বপ্নের মত, তবে যদি আমরা সুন্দর আচরণ ও বেস্ট লেভেলের কাজ করতে পারি তখন ক্রেতারা আসবেন কিন্তু সেই দিন এখনো অনেক দূরে, গনোহারে সাধারণ প্রশিক্ষণে এটা সম্ভব নয়। সত্যিকার অর্থেই হিজড়া বা লিঙ্গ বিচিত্রয় জনগোষ্ঠীর সদস্যদের দিনের পর দিন যেরকম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে সেখানে তাদের মধ্যে জীবনকে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন দেখা বেশ কঠিন। তাই ধৈর্য ধারন করে, মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করাটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং। এজন্য ইচ্ছা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও হিজড়াগীরি পেশায় থেকে যায়। ফরিদপুর জেলায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে থাকার পেছনে যেসকল বিষয় কাজ করে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণে ভীতি বা অনিহা। সরকারি লোক মানেই হিজড়া পেশা উচ্ছেদ ও বেসরকারি লোক মানেই হিজড়াদের ছবি বেচে বিদেশি পয়সা খাওয়ার ধান্ধা এই বিরূপ চিন্তা ভাবনা তো আছেই। পাশাপাশি নিজেদেরকে এক রকম অস্পৃশ্য ভেবে নিয়ে তারা মূল স্রোতে আসতে সংকোচ বোধ করেন। যদিও দিন দিন এই বরফ ভাঙছে, এগিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী তাদের স্ব স্ব যোগ্যতা, কিন্তু সে সংখ্যাটিও খুব বেশি বড় নয়।

সমস্যা সমূহ – • সামাজিক ও পারিবারিক অগ্রহনযোগ্যতা এবং বাস্থানের অভাব • পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া • অধিকার ও সরকারি–বেসরকারি সেবা সম্পর্কে অজ্ঞতা • সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা ও নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে ভীতি • স্কুল পর্যায়ে ঝরে পরা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানএবং কর্মক্ষেত্রে কটাক্ষের শিকার হওয়া • স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহনে বাঁধা • জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা ও সরকারি দফতরগুলোর অসহযোগি মনোভাব • হিজড়া পেশার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ও চেহারার অমিল • এওয়ার্নেস ও কাউন্সিলিং এর অভাব • কর্মদক্ষ হতে অনাগ্রহী ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অপ্রতুলতা • আচরণগত জ্ঞ্যানের অভাব ও সহনশীল মনোভাব তৈরীর সুযোগের অভাব • আইনগত সেবা গ্রহণে ভীতি ও অজ্ঞতা • সাইবার বুলিং, যৌনসহিংসতা ও ব্লাকমেইলেই এর শিকার হওয় সমাধানে করনীয় – • সমাজের সকল ধারায় জেন্ডার সম্পর্কে এওয়ার্নেস বিল্ডাপ • ভিকটিমদের কাউন্সেলিং • সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা • সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা • প্রশাসনের সক্রিয়তা • ট্রেইনিং ও কাজের সুযোগ • বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা/কর্ম পরিবেশ তৈরি একনজরে ফরিদপুর জেলা – ◦ ফরিদপুর জেলায় স্থায়ীভাবে অবস্থানরত হিজড়া ও লিঙ্গবৈচিত্র‍্যময় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা – ১৩৬ জন (আনুমানিক) ◦ হিজরাগীরী পেশায় আছেন – ১২৭ জন ◦ হিজরাগীরীর পাশাপাশি অন্যান্য পেশায় আছেন– ৯ জন ◦ হিজরাগীরী পেশায় থাকতে চান – ৯ জন ◦ অন্যান্য পেশায় যেতে চান – ১২৭ জন ◦ এসএসসি পাশ করেছেন – ১১ জন ◦ জাতীয় পরিচয়পত্র আছে – ৮৪ জন ◦ জাতীয় পরিচয়পত্র নেই – ৫২ জন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *