সিলেটে দূর্যোগ কমেছে বেড়েছে দুর্ভোগ

মুশফাকুর রহমান, সিলেট জেলা প্রতিনিধি:
সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও উপদ্রুত এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। নগরীর উপদ্রুত বেশিরভাগ বাসাবাড়ির পানি নেমে গেলেও ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে নাভিশ্বাস অবস্থা। এক সপ্তাহ ধরে পানিতে নিমজ্জিত বাসাবাড়ির অনেক আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে অনেক এলাকা এখনও প্লাবিত রয়েছে। সুরমা নদীর পানি কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও কানাইঘাট পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সব পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সুরমা।

অন্যদিকে, কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলায় নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলছেন, বন্যা পরিস্থিতির আর খুব একটা অবনতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বেশিরভাগ এলাকা থেকেই পানি নেমে যাবে।

সাম্প্রতিক বন্যায় জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষি ও মৎস্য চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ। আকস্মিক বন্যায় বোরো ফসল, আউশের বীজতলা ও গ্রীষ্ফ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. এসএম শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শতাধিক লোক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আমরা পেয়েছি। চর্মরোগও বাড়ছে। পানি কমলে রোগবালাই আরও বাড়তে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পানিবাহিত রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে এ জন্য এরই মধ্যে ১৪০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার্তদের সেবায় কাজ করছে। ফরিদপুরে তলিয়ে গেছে বাদাম ক্ষেত :কয়েক দিন ধরে ফরিদপুর অঞ্চলে উজান থেকে নামা পদ্মার পানিতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের শতাধিক একর জমির ফসল। এর মধ্যে বেশিরভাগই বাদাম, তিল ও ধান। পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে বর্তমানে পদ্মার পানি ৬.৬৯ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।

পদ্মাতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের এসব জমিতে আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে চরাঞ্চলের মানুষ। উজান থেকে নেমে আসা পানিতে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

রোববার ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মার নিম্নাঞ্চল ডিক্রিরচর ইউনিয়নের পালডাঙ্গি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বাদাম ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। চাষিরা অপরিপকস্ফ বাদাম তুলছেন। এ ছাড়া ধান ও তিলও তুলতে দেখা যায়। নদীর অপর প্রান্তেও তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। ওই এলাকার চাষিরা জানান, গত চার-পাঁচ দিন পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে সব জমির বাদাম তলিয়ে গেছে। আর মাত্র ১৫ দিন থাকলে বাদাম পরিপকস্ফ হয়ে যেত। কিন্তু এখন বাদাম তুলে ফেলতে হচ্ছে। এই বাদাম এখনও পরিপকস্ফ হয়নি। বাধ্য হয়ে তুলে নিয়ে গরু, ছাগলকে খাওয়াতে হচ্ছে। তারা জানান, এক একর জমিতে বাদাম চাষ করতে এবার খরচ হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা। এই বাদাম বিক্রি করেই তাদের সারা বছরের সংসার খরচ চলে। কিন্তু এ বছর বর্ষা মৌসুমের আগেই পানি বেড়ে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পদ্মার চরাঞ্চলের বাদাম চাষিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় এ বছর ৫ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে।

বিশ্বনাথে পানিতে ভাসছে গ্রামের পর গ্রাম :সুরমার পানি কিছুটা কমলেও টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সিলেটের বিশ্বনাথের লামাকাজী, খাজাঞ্চী ও অলংকারীর পর এবার দৌলতপুর ও দশঘর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১১২টি ঘর, ৯২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, সুরমার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের মাহতাবপুর গ্রামের ১৬টি পরিবারের বসতভিটা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার শতাধিক গ্রাম, চারটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩০০ বসতঘর, অসংখ্য রাস্তাঘাট, ৬৯টি প্রাইমারি, ১৫টি হাইস্কুল ও ১০টি মাদ্রাসা বানের পনিতে তলিয়ে গেছে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিয়েছেন বানবাসি মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.