ফরিদপুরে উজানের ঢলে তলাল ফরিদপুরের ১০৯ হেক্টর জমির ফসল

মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুরঃ
উজানের ঢলের পানির প্রভাব ফরিদপুরে নিম্নাঞ্চলেও পড়েছে। এতে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের বিভিন্ন ফসলের খেত তলিয়ে গেছে। এছাড়াও ভাঙন দেখা দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

বুধবার গোয়ালন্দ পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ লিডার সালমা খাতুন জানান, গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি আজ বুধবার ২৫ মে ৩ সেন্টিমিটার পানি কমে ৬.৮২ সে.মিটার সীমায় প্রবাহিত হচ্ছে। যা গত মঙ্গলবার ৬.৮৫ সে.মিটারে প্রবাহিত ছিল।

গত ১৯ মে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বৃদ্ধি পায় ৮০ সেন্টিমিটার, ২০ মে বৃদ্ধি পায় ৪৬ সেন্টিমিটার, ২১ মে বৃদ্ধি পায় ২৪ সেন্টিমিটার, ২২ মে বৃদ্ধি পায় ১১ সেন্টিমিটার, ২৩ মে ৮ সেন্টিমিটার ও ২৪ মে ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়।

এখন পানি কমতে শুরু করলেও কয়েকদিনের হঠাৎ আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে কৃষকের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। স্বাভাবিক নিয়মে এ পানি জুন জুলাইতে বাড়ার কথা ভেবেই কৃষক তার ফসল বুনেছিল।

এখন আকস্মিক বৃদ্ধির ফলে এই পানি চরাঞ্চলের বাদাম, তিল ও ধান খেতে প্রবেশ করছে। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা অপরিপক্ব ফসল ঘরে তুলছে। পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের শতাধিক একর বিভিন্ন জমির ফসল। এর মধ্যে বেশিরভাগই বাদাম। এছাড়া তিল ও ধানও রয়েছে।

সরেজমিনে মঙ্গলবার দুপুরে ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মার নিম্নাঞ্চল ডিক্রিরচর ইউনিয়নের পালডাঙ্গি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বাদাম খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকেরা অপরিপক্ক বাদাম তুলছেন। এছাড়া ধান ও তিলও তুলতে দেখা যায়। নদীর অপরপ্রান্তেও তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের খেত।

পালডাঙ্গি এলাকার কৃষক রমজান আলী ভূঁইয়া জানান, আট বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। ৪/৫ দিন পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে সব জমির বাদাম তলিয়ে গেছে। আর মাত্র ১৫ দিন থাকলে বাদাম পরিপক্ব হয়ে যেতো। কিন্তু এখন বাদাম তুলে ফেলতে হচ্ছে। এই বাদাম এখনও পরিপক্ব হয়নি। তুলে নিয়ে গরু, ছাগলকে খাওয়াবো। অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো।

আরেক কৃষকের স্ত্রী সুফিয়া বেগম বলেন, এক একর জমিতে বাদাম চাষ করেছিলাম। আবাদ করতে খরচ হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা। এই বাদাম বিক্রি করেই আমাদের সারা বছরের সংসার খরচ চলে, কিন্তু এ বছর সব শেষ হয়ে গেলো। গত কয়েকদিন যাবত পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিপক্ক বাদাম তুলে ফেলতে হচ্ছে। এই বাদাম গরুকে খাওয়ানো ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না।

আরেক কৃষক শেখ জুলমত হোসেন বলেন, ১০ বিঘা জমিতে বাদাম ও তিল আবাদ করেছিলাম। আর মাত্র ১০ দিন থাকলে ভালোভাবে ফসল ঘরে উঠাতে পারতাম। পানি বৃদ্ধির ফলে এখনই তুলে ফেলতে হচ্ছে। শুধু আমাদের এলাকা নয়, চরাঞ্চলের একশ’ একরের বেশি জমিতে লাগানো বাদাম, তিল ও ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকেরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

মুরাদ হোসেন নামের অপর এক কৃষক বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম বাদাম চাষ। আর এই বাদাম চাষ করেই যা রোজগার হয় তা দিয়েই সারা বছরের সংসার চলে। কিন্তু হঠাৎ করে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে গেলো। অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পেলে এই কৃষকেরা বেঁচে থাকতে পারবে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদি হাসান মিন্টু জানান, হঠাৎ করেই উজান থেকে নেমে আসা পানিতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল। আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকাই চরাঞ্চলবেষ্টিত। এখানে বসবাসরত বেশিরভাগ বাসিন্দারাই বাদাম চাষ করে থাকে। পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ বাদাম খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বাদাম অপরিপক্ব অবস্থায় তুলে ফেলতে হচ্ছে। কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ওদের অন্যতম আয়ের উৎস এই বাদাম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় এবছর পাঁচ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। এছাড়া পাঁচ হাজার ৩৭৪ হেক্টর জমিতে তিল ও ২২ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলে বাদাম ও তিল আবাদ হয়েছে বেশি।

মঙ্গলবার পর্যন্ত তথ্যে ১০৯ হেক্টর জমির সম্পূর্ণভাবে এবং ১৯৪ হেক্টর জমির ফসল আংশিকভাবে নিমজ্জিত হয়েছে বলে জানান।

অধিদপ্তর আরো জানায়, পানি বেড়ে যাওয়া সবচেয়ে বেশি ফসলি জমি ডুবেছে চরভদ্রাসন উপজেলায়। এই উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে ৫১ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৭ হেক্টর জমির চীনা বাদাম, ৭ হেক্টর বোরো ধান ও ১১ হেক্টর বোনা আউশ, ৮ হেক্টর ভূট্টা ও ৮ হেক্টর জমির তিল ডুবে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয়ের উপ পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. হযরত আলী বলেন, হঠাৎ করে পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। পানি প্রবেশ করায় বাদাম, তিল ও ধানের কিছু খেত তলিয়ে গেছে। বাদাম পরিপক্ব না হলেও খেতে পানি ঢোকার কারণে তুলে ফেলতে হচ্ছে; এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, পদ্মার পানি আজ থেকে কমতে শুরু করেছে। পদ্মায় দশ দিনে দুই মিটারের বেশি পানি বেড়েছে। মধুমতি নদীর কিছু স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় প্রটেকশনের কাজ চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.