বোয়ালমারীতে প্রতিপক্ষের হামলায় দুই খুন, ৮১ জনের নামে মামলা

মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ঈদের দিন দুপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় দুইজন নিহতের ঘটনায় ঘোষপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম ফারুক হোসেনকে প্রধান আসামি করে ৮১ জনের নামে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ০৩। ঘটনার পাঁচদিন পর শনিবার দিবাগত রাতে থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। পুলিশ মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামিকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।

গত মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে গোহাইলবাড়ী-চরদৈতরকাঠি এলাকার শামচু মাস্টারের বাড়ি সংলগ্ন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের কোপে ঘোষপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. খায়রুল শেখ (৪৭) ও গোহাইলবাড়ি বাজারের ব্যবসায়ি মো. আকিদুল মোল্লা (৪৫) নামে দুইজন খুন হয়। খায়রুল চরদৈতরকাঠি গ্রামের মো. মোসলেম শেখের ছেলে ও আকিদুল একই গ্রামের মৃত হাসেম মোল্লার ছেলে। নিহতদের গত বুধবার বাদ মাগরিব চরদৈতরকাঠি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে লাশ খরসূতি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

থানার এজাহার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থানীয় গোহাইলবাড়ি ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলাউদ্দিন আহমেদের (৯২) সাথে গোহাইলবাড়ি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা (গেজেট যাচাই-বাছাইধীন) মরহুম মো. বজলুর রহমানের ওরফে বজলু খালাসির এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিলো। গত ১৬ এপ্রিল স্থানীয় গোহাইলবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে আলাউদ্দিন আহমেদের বড় ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জামান সিদ্দিকী ও মরহুম বজলুর রহমান ওরফে বজলু খালাসির ছেলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেনের দুই প্যানেলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোস্তাফার প্যানেল বিজয়ী হয়ে পুনরায় তিনি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। গত মঙ্গলবার ঈদের দিন বৃষ্টির কারণে ঈদগাহ ও মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে দুইপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। ইচ্ছানুযায়ী যার যার মত বিভিন্ন জায়গায় নামাজ আদায় করেন। দুপুর ২টার দিকে মোস্তফা জামানসহ নিহত-আহতরা গোহাইলবাড়ি বাজারের নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে চা খাচ্ছিলো। এ সময় আসামিরা হতাহতদের উপর রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় মারাত্বক আহত মোস্তফার চাচাতো ভাই আকিদুল মোল্যা (৪৫), খায়রুল শেখ (৪৭) এবং তার আপন দুইভাই শারিরীক প্রতিবন্ধী মাসুদ আহমেদ (৪৭) ও আলমগীর আহমেদসহ (৫০) ৯জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আকিদুল মোল্যাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত খায়রুল শেখ, মাসুদ আহমেদ ও আলমগীর আহমেদের অবস্থা আশংজনক হওয়ায় তাদেরকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। ফরিদপুর নেওয়ার পথে কাদিরদী এলাকায় খায়রুল শেখ মারা যান। প্রতিবন্ধী মাসুদ আহমেদ ও আলমগীর আহমেদ ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ভাড়ালিয়ারচর গ্রামের বারিক মোল্যার ছেলে রাজিবুল (২৯), সাজেদুল (২৬), আব্দুল কাদের (৪০), সোহরাবের ছেলে সোহেল (২২) ও আকবর শেখের ছেলে (৬৫) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। হতাহতদের প্রতিপক্ষ আরিফুর রহমানের বড় ভাই গোপালগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ হোসেন ঈদের ছুটিতে এলাকায় অবস্থান করলেও বিভিন্ন কারণে তাঁকে আসামি করা যায়নি বলে জানা যায়। হত্যাকান্ড ঘটনার পাঁচদিন পর শনিবার দিবাগত রাতে থানায় নিহতদের চাচাতো ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জামান সিদ্দিকী বাদি হয়ে ৮১ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক আরো ৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছে।

গতকাল রবিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নিহত গোহাইলবাড়ি-চরদৈতরকাঠি গ্রামের পাশাপাশি পরিবার দুটিতে চলছে শোকের মাতম। নিহত দুইটি পরিবারের মধ্যে আকিদুলের স্ত্রী দুই বছর আগে মারা যাওয়ায় নিহত আকিদুলের পাঁচ সন্তান এখন এতিম হয়ে গেছে। এদিকে নিহতের ঘটনায় গোহাইলবাড়ি, ভাড়ালিয়ারচর, চন্ডিবিলা, রাখালগাছি, লংকারচর গ্রামে পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে। গোহাইলবাড়ি বাজারের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।

নিহতদের প্রতিপক্ষ আরিফুর রহমানের মাতা আফরোজা বেগম লাভলী জানান, আমার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে দুই ছেলে ও এক মেয়ে সরকারি কর্মকর্তা। বড় ছেলে শরিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মেজো ছেলে কৃষি কর্মকর্তা, আর মেয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা। মেজো ও ছোট ছেলে বাদে সবাই বাইরে থাকে। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন তারা। মোস্তফার বাবা আলাউদ্দিন চেয়ারম্যানের এলাকায় আরিফের বাবার দ্বন্দ্ব ছিল। আমার ছেলেরা হামলার ঘটনার সাথে জড়িত ছিলো না।

মামলার বাদী মোস্তফা জামান সিদ্দিকী বলেন, বজলুর রহমান ওরফে বজলু খালাসির সাথে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আমার বাবার সাথে ঝামেলা চলে আসছে। এলাকায় আমরা যে কাজ করি তার বিপরীত কাজ করে আমাদের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করায় ছিলো আরিফদের উদ্দ্যেশ্য। গত ১৬ এপ্রিল স্কুল নির্বাচনে হেরে গিয়ে আমাদের উপর তারা আরো ক্ষীপ্ত হয়ে আমাকে হত্যার জন্য হামলা করেছিলো। আমাকে ভাইয়েরা বাঁচাতে গিয়ে দুই চাচাতো ভাই খুন হয়। হামলায় আমার প্রতিবন্ধী ভাই মাসুদ এখন মৃত্যুশর্য্যায় রয়েছে। আমার আরেক ভাই আলমগীরসহ আমাদের ৬জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আসামিদের ফাঁসির দাবি করেছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, আমরা প্রথম এজাহারে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নাম দিলেও পরে সেটা পরিবর্তন করে জমা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন জঠিলতায় তাঁকে আসামির তালিকায় নাম দেওয়া দিতে পারিনি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার উপপরিদর্শক মামুন ইসলাম জানান, মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি গোহাইলবাড়ি গ্রামের মো. নওশের শেখ (৪৫), ১২ নম্বর আসামি চরদৈতরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা ও ঘোষপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন মোল্যা (৩৪), ৭০ নম্বর আসামি চন্ডিবিলা গ্রামের মতিয়ার রহমান (৪২) ও ৭২ নম্বর আসামি দেলোয়ার হোসেনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ফরিদুপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা) সার্কেল সুমন কর বলেন, ঈদের দিনে প্রতিপক্ষের হামলায় দুইজন নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনাস্থল এখন শান্ত রয়েছে। হতাহতদের প্রতিপক্ষ আরিফুর রহমানের বড় ভাই গোপালগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ হোসেনকে আসামির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলা বাদির এজাহারের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.