খামার করে ভাগ্যের পরিবর্তনে ধাবিত আলফাডাঙ্গার সুফিয়া

মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুর:
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও /রহিমদ্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।/ বাড়ি তো নয় পাখির বাসা-ভেন্না পাতার ছানি,/ একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। /একটুখানি হওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, / তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে’ আসমানীকে সামনে রেখে পল্লী কবি জসীম উদদীন তার আসমানী কবিতায় এভাবেই ফরিদপুরের হত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রা তুলে ধরেছিলেন প্রায় ৬৭ বছর আগে। সময়ের পরিবর্তনশীলতায় অনেক কিছু বদলালেও ফরিদপুরের আসমানীদের চিত্র এ যাবৎকালে রয়ে গিয়েছিল এভাবেই।

এখন সময় বদলেছে-পরিবর্তন হয়েছে আসমানীদের জীবনের; ভেন্না পাতার ছাউনী থেকে তারা এখন বসবাস করছে রঙ্গিন টিন আর পাকা দেয়ালের আধাপাকা বাড়িতে। সেই বাড়িতেই করছে শাক- সবজির আবাদ। কেউবা করছে হাঁস মুরগি-ছাগল-গরু পালন। সন্তানদের পাঠাচ্ছে স্কুলে। বসতির দুশ্চিন্তা ছেড়ে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে এগিয়ে নিচ্ছে সংসার। সংসারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ভূমি ও গৃহ প্রদান করায় ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, মধুখালী, সালথা, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, সদরপুর, চরভদ্রাসন উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে যাওয়ার এ চিত্র সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা গেছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পকের বাসিন্দারা গঠন করেছে সমবায় সমিতি; নিয়মিত নিচ্ছে প্রশিক্ষণ; অনেকের একাডেমিক শিক্ষা না থাকলেও নানা প্রশিক্ষণে তারা হয়ে উঠছে স্বশিক্ষিত। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকিতে ক্রমেই সময়ের সাথে সাথে উন্নয়নের নানা দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। বদলে যাওয়া সেই আসমানীদের অর্থনৈতিক পরিবর্তন চিত্রের কিয়দাংশ ফুটে উঠেছে আলফাডাঙ্গা উপজেলার স্বপ্ন নগরের সুফিয়াকে নিয়ে আজকের প্রতিবেদনে।

খামার করে ভাগ্যের পরিবর্তন করছে আলফাডাঙ্গার সুফিয়া। এক মুঠ ঘাস উঠালেই তেরে আসত ক্ষেতের মালিক। বিশ্রি ভাষায় করতো গালিগালাজ। মা-বাপ তুলে গালি দিতেও মুখে বাধতো না। সেই জন্যই মনের মধ্যে খুব শখ থাকলেও বোয়ালমারীর বনমালীতে থাকাকালীন গরু ছাগল পালন করতে পারেন নাই। শুধু গরু ছাগলই নয় হাস মুরগি পালনেও ছিল বাধা। কারো বাড়িতে গেলেই ঝগড়া বাধিয়ে দিত। হাস মুরগিকে নুলা করে দিত। তাই কোন কিছু না করেই মনে দুঃখ নিয়ে স্বামীর সামান্য উপার্জনেই এতকাল অন্যর জমিতে বাসবাস করত। উপার্জনের আশা থাকলেও এগিয়ে যেতে না পারা নিজের জীবনের কথা জানাচ্ছিলেন সুফিয়া বেগম (৪৩)।

তবে এখন সুফিয়ার ভাগ্যের বদল ঘটতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া জমিসহ ঘর পেয়েছে আলফাডাঙ্গার স্বপ্ন নগরে। এখন আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে। গুছিয়ে আনছে নিজের সংসার। সাজিয়েছে নিজের মতো করে একটি খামার। গরু ছাগল মুরগির পরিচর্যা করে কেটে যাচ্ছে দিনের অধিকাংশ সময়। নিজে সময়মত না খেলেও ওদের খাওয়াচ্ছে সঠিক সময়ে।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ সোমবার দুপুরে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে। সে জানায় তার অতীতের কষ্টের কথা। বলে বর্তমানের ব্যস্ততার কথা। প্রকাশ করে ভবিষ্যত স্বপ্নের পরিকল্পনা।

জানায়, বোয়ালমারীতে কখনো সরকারি খাস জমিতে আবার কখনোবা কারো জমিতে খুপরি তুলে থাকতো স্বামীসহ ৫ ছেলে মেয়ে নিয়ে। স্বামী মিলন মোল্লা নসিমন চালক। তার আয়ে চাল-ডাল-লবন তরকারি কিনতেই সব উপার্জন শেষ হয়ে যেত। তাই সব সময় বাড়তি কিছু উপাজর্নের চিন্তা করতো সে। কিন্তু নানা বাধায় পারতো না। গত বছর যখন আলফাডাঙ্গার স্বপ্ন নগরে জমিসহ ঘর পায় তখনই শুরু করে স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ঘরের পেছন সংলগ্ন এক চিলতে জায়গায় ১০ ফুট পুরাতন টিন কিনে বারান্দা দিয়ে ১টি গাভী পালন শুরু করে। তিন মাস আগে একটি বাছুর দেয় গাভীটি। গাভীর দুধ বেচে ১ টি বকরিও কিনে সে। সেটিও বাচ্চা দিয়েছে। এখন মোট ছাগলের সংখ্যা দাড়িয়েছে ছোট বড় মিলে ৫টি। মুরগিও রয়েছে বেশ কয়েকটি। সবজির অভাব মেটাতে এখন শুরু করেছেন লাউ আর সিম গাছ রোপন। এসবের পরিচর্যা করেই তার দিন কেটে যায়। আগামীতে সে তার গরু ছাগলের খামারটিকে আরো বড় করবে বলে জানায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকারকে ধন্যবাদ জানান তাকে জমিসহ ঘর দেয়ায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আলফাডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত তার খোজ খবর রাখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.