ভোলায় ফসলি জমির সর্বনাশ করছে ইটভাটা

সাব্বির আলম বাবু, ভোলাঃ
ভোলায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। জেলার ১২৫টি ইটভাটার জন্য প্রতিবছর প্রায় ৪১৬ একর আবাদি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে ফসলি জমির উর্বরতা কমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে ভোলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিক এলাহী বলেন, জৈব উপাদান মাটির প্রাণ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমির জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে।

ফসলি জমিতে যেখানে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকা দরকার, সেখানে ভোলায় আছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কৃষিজমির উপরিভাগের (টপ সয়েল) মাটি কেটে নেওয়ার ফলে অত্যাবশ্যকীয় জৈব উপাদানসহ মাটির পুষ্টি উপাদানের চরম ঘাটতি হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে ফসলি জমির উপরিভাগ কেটে নিলে জৈব উপাদান শূন্যে চলে আসবে। তখন রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়বে, খাদ্যে পুষ্টিগুণ কমে আসবে। ভোলার চর ভেদুরিয়া ও বরিশালের মেহেন্দি গঞ্জের আলীমাবাদ ইউনিয়নের সীমানায় গাগুরিয়া বিলের সব জমি তিন ফসলি। জমির পরিমাণ হাজার একরের কম নয়।

ওই বিলের কৃষকেরা বলেন, বিলের জমি তিন ফসলি হলেও এখন শুধু খানাখন্দ। ফসলি জমি নেই বললেই চলে। সব ভাটায় চলে গেছে। প্রতিবছর পাকা ধান কাটার মৌসুমে মাটি ব্যবসায়ীরা রাতারাতি খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কেটে ইটভাটার ভাটায় পাঠিয়ে দেন। অনেক সময় দিনেও কাটেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ভোলায় মোট ফসলি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮২ হেক্টর। এর মধ্যে নিয়মিত আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৯২ হাজার ৩৮২ হেক্টর। অর্থাৎ ভোলায় পতিত বা এক ফসলি জমির পরিমাণ নেই বললেই চলে। ইটভাটার জন্য যতটুকু মাটি কাটা হচ্ছে, সবই কৃষিজমির। লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের সাতদরুন বিলের জমির মালিক কৃষক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিল থেকে মাটি কেটে নেয় চরভূতা ইউনিয়নের নতুন মুগুরিয়ার ইটভাটার লোকজন। শীতে মাটি কেটে নেওয়ার পরে বর্ষায় পাশের জমির মাটি ভেঙে পড়ে আবার ভরাট হয়। আবার শীতে মাটি বিক্রি করে। এতে এ বিলে আগের মতো ফসল ফলছে না। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩-এ উল্লেখ আছে,ফসলি জমি, জনবসতিপূর্ণ এলাকা, সংরক্ষিত এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, বনভূমি, জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। ভোলার ১২৫টি ইটভাটার মধ্যে ৮০টি ইটভাটা অবৈধ বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম কায়েদ বলেন, অবৈধভাবে ইট উৎপাদনকারীকে তাঁরা সমিতির সদস্য করছেন না। ইটভাটার মালিক, কারিগর ও মাটি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইটের জন্য সাধারণত জমির উপরিভাগ থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। মৌসুমের শুরুতে একটি ইটভাটায় কমপক্ষে ১০ লাখ ঘনফুট মাটির মজুত (জোগান) রাখতে হয়। এর মধ্যে গড়ে প্রায় ৮ লাখ ঘনফুট মাটি ব্যবহৃত হয়। বছরে ছয় থেকে সাত মাস ইট তৈরির মৌসুম থাকে। এক হাজার ঘনফুট মাটি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। দীর্ঘদিন ধরে মাটি ব্যবসার সঙ্গে রয়েছেন মনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ভোলায় এক শতাংশ জমি থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ঘনফুট মাটি পাওয়া যায়। প্রতি ইটভাটায় মৌসুমের শুরুতে কমপক্ষে ১০ লাখ ঘনফুট (৩ দশমিক ৩৩ একর জমির) মাটি মজুত করে। সে হিসাবে ভোলার ১২৫টি ইটভাটায় বছরে প্রায় ৪১৬ দশমিক ৬৬ একর জমির মাটি ইটভাটায় যাচ্ছে। এ ছাড়া ভোলার মাটি ঢাকা, মুন্সিগঞ্জসহ আশপাশের জেলায় যাচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাসান ওয়ারিসুল কবির বলেন, ইটভাটায় জমির উর্বর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *