ফ্রান্স চিলি আর্জেন্টিনার স্ট্রবেরী ফলের চাষ এখন শ্রীপুরে

টি.আই সানি, গাজীপুর প্রতিনিধি:
ফ্রান্স চিলি আর্জেন্টিনার ফল স্ট্রবেরী এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গাজীপুরে চাষ হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে স্ট্রবেরী জমিগুলো নানান রঙ ধারণ কেের। সাদা ফুল, হলুদ ফল ও পরিপক্ক পাকা স্ট্রবেরী লাল রঙ ধারণ করে। বেশি ফলনে অধিক লাভ ও উচ্চ বাজারমুল্যের কারণে এ চাষে মনোযোগী হচ্ছেন চাষীরা। প্রতিদিন জমি থেকে পরিপক্ক ফল সংগ্রহ ও তা বাজারজাতকরণের সুবিধা থাকায় কাঁচা টাকাও গুণছেন তারা।

গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলার দুটি গ্রামে স্ট্রবেরী চাষ হচ্ছে। শ্রীপুরের বরামা এবং কাপাসিয়ার সিংহশ্রী এলাকায় এ চাষের বিস্তৃতি ঘটছে। কেউ কেউ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ চাষ করছেন।

শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়নের বরামা গ্রামের রুবেল জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। তিনি জানান, ৬ বছর যাবত স্ট্রবেরী চাষ করেন। অন্যান্যবার ৫ কাঠা জমিতে চাষ করতেন। প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে প্রায় তিনগুণ লাভ হওয়ায় এবার ৭ কাঠা জামিতে চাষ করেন। কিন্তু তার জমিতে রোপন করা “সেঞ্চুয়েশন” জাতের স্ট্রবেরী চারা গাছে ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। গাছে শেকড় পঁচা রোগ দেখা দিয়েছে। আক্রান্তের দু’ তিনদিনের মধ্যে গাছের পাতা কালো হয়ে যাচ্ছে। ওইসব গাছের অর্ধেক শেকড় পঁচে গেছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহারের পরও নিরাময় পাচ্ছেন না। “সেঞ্চুয়েশন” জাতের স্ট্রবেরী চারা গাছে পাতা কালো হয়ে যাওয়া ও শেকড় পঁচা রোগ দেখা দেয়। এ জাতের চারা গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

বরামা গ্রামের আব্দুস ছাত্তারের ছেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ১১ বছর যাবত স্ট্রবেরী চাষ করছেন। প্রতিবেশী মোশারফ হোসেনের স্ট্রবেরী চাষাবাদ দেখে পরের বছর থেকে তিনি নিজেই চাষাবাদ শুরু করেন। প্রথমে রাবি-৩ জাতের স্ট্রবেরী আধা কাঠা জমিতে চাষ করেন। এতে তার ৩৫ হাজার টাকা লাভ হয়। পরের বছর “ফেস্টিভাল” নামের আরও একটি জাতের চাষ করেন। লাভজনক হওায় দ্বিতীয় বছর চার কাঠা জমিতে চাষ করেন। চার কাঠা থেকে উৎপাদিত স্ট্রবেরী সাড়ে তিন লাখ টাকা বিক্রি করেন। দ্বিতীয় বছরে নিজেই চারা সংরক্ষণ করেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে স্ট্রবেরী চাষ করে যাচ্ছেন। এবছর সাত কাঠা জমিতে এ চাষ কেেরন।

তিনি জানান, “উইন্টারডন” জাতের স্ট্রবেরী চারা গাছ গাজীপুরের পরিবেশের সাথে বেশ ভাল মেশে। এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি, ফলের রঙ উজ্জল এবং আগাম উৎপাদন হয়। “ফেস্টিভাল” জাত দেরীতে উৎপাদন হয়। ফলে বৃষ্টি ও বিরূপ আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। “উইন্টারডন” জাতের একটি চারা গাছ থেকে মৌসুমে কমপক্ষে দুই কেজি ফল পাওয়া যায়। চার কাঠা জমিতে ৫ হাজার স্ট্রবেরী চারা রোপণ করা যায়।

এক কাঠা জমিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তিনি বলেন, কার্ত্তিক মাসে জমিতে রোপন করতে হয়। পৌষের মাঝামাঝি সময় থেকে ফলন আসে। চৈত্র মাস পর্যন্ত ফল বিক্রি করা যায়। গত বছর ২লাখ টাকা খরচ করে ৫কাঠা জমি থেকে ৬ লাখ টাকা বিক্রি উঠেছে। এবার ৭ কাঠা জমি থেকে আরও বেশি বিক্র এবং লাভের প্রত্যাশা রয়েছে।

প্রতিদিন সকালে ১৮ থেকে ২০ কেজি স্ট্রবেরী সংগ্রহ করতে পারেন। পাখি ছাড়া ক্ষতি করার মতো প্রাণি নেই। নিজের সংগৃহীত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে সার, কীটনাশক প্রয়োগ করেন। কৃষি বিভাগের লোকজন তার চাষ দেখতে আসেন। কিন্তু তাদের পরামর্শ স্ট্রবেরী চাষের জন্য যথাযথ নয়।

চাষীদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সেঞ্চুয়েশন” জাতের স্ট্রবেরী চারা গাছের জাত চাষ করে এলাকার অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সম্ভব নয়। তাই এ জাত বাদ দিয়ে ভিন্ন জাতের স্ট্রবেরী চারা গাছের জাত নিয়ে চাষাবাদের পরামর্শ দিয়েছেন।

এলাকার চাষীরা একসাথে গাড়ীতে করে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর, কারওয়ান বাজারের আড়ত, গাজীপুরের বাইপাস, প্রভৃতি এলাকায় স্ট্রবেরী রপ্তানী ও বিক্রি করেন। তারা জমি থেকে প্রতি কেজি ৭’শ টাকা দরে বিক্রি করেন।

অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক ইসরাফিল হোসেন বলেন, ১৬ বছর আগে ছেলে মোশারফ হোসেন ময়মনসিংহ থেকে স্ট্রবেরী চাষের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু তখন দেশে স্ট্রবেরীর জাত আসেনি। দুই বছর পর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে এক হাজার স্ট্রবেরীর চারা সংগ্রহ করেন। ওই বছর রোপণ করে এলাকা ও সারাদেশে স্ট্রবেরী চাষের খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার এ চাষ দেখে আশপাশের অনেকেই এ চাষে উৎসাহিত হন। এখন বরামা দক্ষিণপাড়া গ্রামটি স্ট্রবেরী চাষের গ্রাম হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে।

চাষী ইমাম উদ্দিন জানান, এবার সেঞ্চুয়েশন জাতের স্ট্রবেরী চারা লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিন লাখ টাকা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই।

একই এলাকার প্রতিবেশী চাষী দুদু মিয়াসহ অন্যান্যরা বলেন, স্ট্রবেরী চাষ অনেক লাভজনক। যারা স্ট্রবেরী চাষ করছেন প্রত্যেকেই বছরে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা লাভ করছেন।

কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী এলাকার চাষী মিফাত হোসেন জানান, গত বছর পাঁচেক যাবত তিনি স্ট্রবেরী চাষ করছেন। এ চাষ প্রায় চার মাস মেয়াদী কিন্তু লাভজনক। চার মাস পরিশ্রম করলে তিনগুণ লাভ করা সম্ভব। এখন রাজশাহী থেকে স্ট্রবেরীর চারা সংগ্রহ করতে হয় না। এলাকাতেও চারা পাওয়া যায়। এক কাঠা জমিতে এক হাজার চারা রোপণ করা যায়। জমিতে রোপণের খরচসহ একেকটি চারার মুল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা।

এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ও শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের দক্ষিণ বরামা গ্রামের বেশ কিছু চাষী স্ট্রবেরী চাষ করছেন। দ্রুত পঁচনশীল হলেও এটি অধিক লাভজনক চাষ। সাধারণত ছত্রাকের আক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো ধরণের সমস্যা হয় না। ছত্রাক থেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনমত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে রোগবালাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.