আজ ১০ ডিসেম্বর মাদারীপুর মুক্ত দিবস

কে এম, রাশেদ কামাল, মাদারীপুর প্রতিনিধি:
মাদারীপুর মুক্ত দিবস ১০ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে খলিল বাহিনীর ৩‘শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদার বাহিনীর মধ্যে একটানা ৩৬ঘন্টা সম্মুখ যুদ্ধের পর এক মেজর ও এক ক্যাপ্টেনসহ ৩৯ জন আত্মসমর্পণ করায় মাদারীপুর শত্রু মুক্ত হয়। অথচ স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর আসন্ন হলেও চূড়ান্ত হয়নি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। ফলে অবহেলায় নামহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ’। প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছ থেকেও মেলেনি সদুত্তর।

১৯৭১ সালে রণাঙ্গনের যুদ্ধে ২৫ নভেম্বর শিবচর, ৪ ডিসেম্বর রাজৈর ও ৮ ডিসেম্বর কালকিনি থানা শত্রু মুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। এ সব থানা ক্যাম্পের হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মাদারীপুর শহরের এ.আর হাওলাদার জুট মিলের অভ্যন্তরে ও বর্তমান মাদারীপুর সরকারি কলেজে অবস্থান নেয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে তাদের ঘিরে রাখে। ৮ ডিসেম্বর দুপুরে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক আবদুল মতিনের জীপের ড্রাইভার আলাউদ্দিন মিয়া গোপনে গিয়ে কলাগাছিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সংবাদ পৌঁছে দেয় যে, ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে পাকি বাহিনী মাদারীপুর থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাবে। এ সংবাদ পেয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান সদর উপজেলার ঘটকচর থেকে সমাদ্দার ব্রিজের পশ্চিম পাড় পর্যন্ত মহাসড়কের দু‘পাশে প্রায় ৪.কিমি ব্যাপী অবস্থান নেয়। ৯ ডিসেম্বর ভোর ৫ টায় হানাদার বাহিনী গোলবারুদ, অস্ত্র ও কনভয়সহ তাদের বাঙালি দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে ঘটকচর ব্রিজ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমন শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তাড়া খেয়ে হানাদার বাহিনী দ্রুত গাড়ি চালাতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা একটি কনভয় থেকে নেমে কভার ফায়ার করতে করতে আরো দ্রুত সকল গাড়ি নিয়ে এগুতে থাকে। এ সময় হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া কনভয় থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে নেয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি বর্ষণে ভীত হয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে হানাদার ও তাদের দোসরদের একটি অংশ সমাদ্দার ব্রিজের দুইপাশে পূর্বে তৈরি করা বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়ে পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে। অপর অংশ ২টি কনভয় ও একটি জীপসহ সমাদ্দার ব্রিজ পাড় হয়ে রাজৈর থানার টেকেরহাটের দিকে পালিয়ে যায়। তারা টেকেরহাট ফেরি পাড় হয়ে ফরিদপুর যাওয়ার সময় ছাগলছিড়া নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। উপায়ান্ত না দেখে ৩০ পাকিসেনা ও ১২ রাজাকারসহ আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। এদিকে সমাদ্দার ব্রিজে ৯ ডিসেম্বর সারাদিন সারারাত এবং ১০ ডিসেম্বর সারাদিন সম্মুখ যুদ্ধ চলে মুক্তিযোদ্ধা ও হানাদার বাহিনীর মধ্যে। তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনীর গোলা-বারুদ স্তিমিত হয়ে আসলে ১০ ডিসেম্বর বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইকযোগে পাকি বাহিনীকে আত্মসর্পনের আহবান জানানো হয়। এতে সাড়া দিয়ে হানাদার বাহিনী রাইফেলের মাথায় সাদা কাপড় উড়িয়ে বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে আসে এবং পাশের খাল থেকে পানি, গাড়ি থেকে শুকনো খাবার ও গোলা-বারুদ নিয়ে পূনরায় বাঙ্কারে ঢুকে গোলাগুলি শুরু করে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা আরো ক্ষীপ্র হয়ে পাল্টা আক্রমন শুরু করে। দুইপক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধে ২০পাকি সেনা ও ১৪ মুজাহিদ রাজাকার নিহত হয়। যুদ্ধে শহীদ হন মাদারীপুরের সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার হোসেন বাচ্চু।

মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে ২০ সেনা ও ১৪ মুজাহিদ নিহত হওয়ায় হানাদার বাহিনীর মনোবল একে- বারে ভেঙ্গে পড়ে। এক পর্যায়ে তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে এলে সন্ধ্যার আগেই হানাদার বাহিনীর মেজর আবদুল হামিদ খটক ও ক্যাপ্টেন সাঈদ ৩৭ পাকিসেনা নিয়ে ৩৯ জল্লাদ খলিল বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। মিত্র বাহিনী ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকি বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যদিয়ে মাদারীপুর শত্রু মুক্ত হয়।
আত্মসমর্পনের পর মুক্তিযোদ্ধারা আত্মসমর্পনকারীদের অস্ত্রশস্ত্র কভার করে সারা রাত সমাদ্দার ব্রিজে অবরোধ করে রাখেন। পরদিন ১১ ডিসেম্বর সকালে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কলাগাছিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও শত-শত স্বাধীনতাকামী গ্রামবাসী সারা দিন সারা রাত আনন্দ উল্লাস করতে থাকে।

১২ ডিসেম্বর যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী আত্মসমর্পনকারী পাকি সেনাদের মাদারীপুরে এনে সাব-জেলে বন্দী করে রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করার পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ফরিদপুর থেকে এসে মাদারীপুর মহকুমা কারাগার থেকে মেজর আবদুল হামিদ খটক, ক্যাপ্টেন সাঈদ ও ৩৭ সেনা সদস্যসহ আত্মসমর্পনকারী মোট ৩৯ জন হানাদারকে নিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.