১ টাকার ‘ চা’ ও ১ টাকার পানে পুরোদেশে আলোচিত নাটোরের বাগাতিপাড়া

মোঃ রাশেদুল আলম রুপক, নাটোর জেলা প্রতিনিধি:
বর্তমান সময়ে এক কাপ চায়ের সর্বনিম্ন মূল্য ৫ টাকা। আর মসলা যুক্ত একটি পানও বিক্রি হয় অন্তত ৫ টাকায়। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু নাটোরের বাগাতিপাড়ার ফাগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের এক টাকার মোড়ের রজব বেপারী লালনের দোকানে। সেখানে ১ টাকায় এখনও পাওয়া যায় আদা ও চিনি যুক্ত এক কাপ চা ও সমপরিমান টাকায় মিলে মসলা যুক্ত একটি পান। এতো কম দামে চা বিক্রি করে তিনি নওপাড়াসহ পুরোদেশেই ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছেন।

কৌতুহল থেকেই তাঁর এই চা-পান খেতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষরা আসে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে বিকেলে ভিড়জমায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত মানুষরা। প্রতিদিন তিনি প্রায় ১ হাজার ২০০ কাপ চা ও ১ হাজারের অধিক পান বিক্রি করে থাকেন। স্থানীয়রা জানায়, ১৯৯১ সালে লালন এই মোড়ে চা-পান বিক্রি শুরু করেন। তখন তিনি ৫০ পয়সায় ১ টি চা ও সমপরিমান অর্থে ১টি পান বিক্রি করতেন। তখন ওই মোড়ের নাম ছিল নওপাড়া মোড়। পরবর্তিতে ১৯৯৪ সালে তিনি চা ও পানের দাম বৃদ্ধি করে ১টাকা করেছেন এবং এখন পর্যন্ত তিনি ১টাকায় চা ও সমপরিমান টাকায় পান বিক্রি করছেন। তাঁর এই একটাকায় চা ও পান বিক্রি করার সুবাদে ওই মোড়ের নাম কখন যে একটাকার মোড় হয়ে গেছে তা এলাকার মানুষরা বুঝেই উঠতে পারেননি।

এখন সারাদেশের সচেতন মানুষরা বাগাতিপাড়ার এই এক টাকার মোড় সম্পর্কে অবগত। এমনকি এই একটাকার মোড়ের নাম “ গুগল ম্যাপেও” পাওয়া যায়। চা বিক্রেতা রজব ব্যাপারী লালন বলেন, শুধু মাত্র টাকা রোজগার করাই আমার মূল উদ্দেশ্য নয়। আমি মানুষের সেবায় ১টাকা করে চা ও পান বিক্রি করছি। আমার ৩০ বছরের ব্যবসায় প্রথম দুই বছর ৫০ পয়সা করে চা-পান বিক্রি করি। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত ১ টাকায় বিক্রি করে আসছি। এথেকে আমি মানুষের যে ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি তাতে বেঁচে থাকা পর্যন্ত মূল্য আর বাড়ানোর ইচ্ছা নাই। লাভ-ক্ষতি কোনদিন হিসাব করে দেখিনি। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ৫ বিঘা জমি আর এই ব্যাবসা দিয়ে দুই সন্তানের পরিবার খেয়ে-পরে চলে যায়।

লালন আরও বলেন, এই চা ও পান খেতে বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলা থেকেই মানুষ এসেছে। এমনকি সুইজারল্যান্ডের পর্যটকরাও তাঁর এই চা ও পান খেয়ে গেছেন। ৮ কিলোমিটার দুর থেকে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, তাঁরা আজকে আটজন এই চা ও পান খেতেএসেছেন। প্রতি মাসে এভাবেই দল বেঁধে হাঁটতে-হাঁটতে অন্তত ৪ থেকে ৫ দিন আসেন তাঁরা। অন্য দোকানে যে চা ও পান ৫ টাকায় কিনে খেতে হয় ঠিক একই মানের চা এখানে ১ টাকায় খাওয়া যায়। ১০ কিলোমিটার দূর থেকে উপজেলার জামনগর থেকে আসা সজিব হাসান বলেন, তাঁরা শুধু একটাকার মোড়ের নামই শুনেছেন কিন্তু আসা হয়নি কোনোদিন। তাই চার্যার অটো নিয়ে পাঁচজন এসেছেন।

পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন দয়ারামপুর থেকে আসা রাকিব হাসান বলেন, তিনি আজ প্রথম এসেছেন। কিন্তু তাঁর সাথে আসা দুই বন্ধু এর আগেও অনেকবার এসেছেন। তাঁরা বাইসাইকেল নিয়ে এসেছেন। শুক্রবার বিকেলে ১ টাকার মোড়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক মানুষ সেই চা ও পান খাচ্ছেন। তাই নিজেও একটি চা খেয়ে দেখেন এই প্রতিবেদক। তাতে যা মনে হয়েছে অন্য দোকানের ৫ টাকার চায়ের থেকে এই চা কোন অংশেই কম নয়। ঠিক তেমনি পানও কয়েকটি মসলার সমন্ময়ে তৈরি করা হচ্ছে।

ইউএনও প্রিয়াংকা দেবী পাল বলেন, দীর্ঘদিন থেকে নিয়মিত ভাবে এতো কম দামে চা ও পান বিক্রি করাতে সারা দেশে বাগাতিপাড়া নামটি পরিচিতি লাভ করেছে। সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শুভকামনা রইল। এবং আগামীতে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রয়োজন হলে তাঁকে সহযোগিতা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *