বহুমাত্রিক অর্থবহুল একটি শব্দ ‘চিঠি’-সাব্বির আলম বাবু

অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানব সভ্যতার এক অনন্য-অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো চিঠি বা পত্র। যার প্রমান মেলে ঐতিহাসিক বিখ্যাত রাজা-বাদশা-সম্রাট বা রাস্ট্র নায়কেরা নিজস্ব দূত-বার্তা-পত্র বা চিঠিবাহকের মাধ্যমে একে অন্যের কাছে বিভিন্ন মতামত প্রেরন করতেন। এই চিঠিগুলো থাকতো উন্নত, রাজসিক, সৌখিন, আভিজাত্যের প্রতীক। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখার পর থাকতো রাজার সিলমহর। এই বার্তা বাহক বা দূতগণ ভিন্ন রাজ্যে বা রাস্ট্রে গিয়ে রাজার প্রতিনিধির মতোই সম্মান পেতো। চিঠি বা পত্রের আভিধানিক অর্থ ব্যাপক। সহজে বলা চলে পরস্পর যোগাযোগের প্রথম, সহজ, সাধারন ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলো চিঠি।

সমাজের সর্বক্ষেত্রে চিঠির ছিলো অবাধ প্রচলন যেমন- কখনো চাকরীর জনিত, কখনো সরকারী দাপ্তরিক, কখনো প্রেমজনিত, কখনো সাহিত্য বিষয়ক, কখনো আইন-আদালত, কখনো পারিবারিক, কখনো সংবাদ জনিত ইত্যাদি। নিরেট সাহিত্য চর্চারও অন্যতম মাধ্যম হিসাবে চিঠিকে গন্য করা যায়। বহু স্বনামধন্য দেশ-বিদেশের সাহিত্যিকদের স্বহস্তে লেখা আবেগ-উপদেশ-নির্দেশ-তথ্য সমৃদ্ধ চিঠি আজো সাহিত্যের জন্য বড়ো সম্পদ। আমাদের কৈশোরে ভাইবোন আর আশে পাশের লোকজনকে দেখতাম লুকিয়ে ভালোবাসার মানুষটিকে চিঠি লিখতো। সেই চিঠি লেখা বা পাঠানোর সময়ে কেউ যেন না দেখে তার জন্য কতো কসরতই না করতে দেখতাম তাদের। দূরের ভালোলাগার মানুষটিকে চিঠি লিখে জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। সেই খামে মোড়ানো অতিকাঙ্ক্ষিত চিঠির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভালোবাসার সবটুকু। এখনকার প্রজন্ম চিঠির সেই স্বাদটা কি জানে?

নিজের হৃদয়ের কথা আর অভিব্যক্তি প্রকাশ করার একমাত্র মাধ্যম মানেই ছিল চিঠি। চিঠি যেন ছিল স্বর্গীয় এক দূতের মতো। কিন্তু সেই খাম আর কাগজে গোটা গোটা হাতের লেখা চিঠির কথা আমরা যেন ভুলতেই বসেছি। চিঠি লেখার সময়ই তো আজকাল তাদের নেই। কালের পরিক্রমায় আর সময়ের স্রোতে চিঠির ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। শূন্য পোস্টবক্স এখন খাখা করে চিঠির আশায়। ডাকঘরের চিঠি বিষয়ক কার্যক্রমের গন্ডি এখন সীমিত হয়ে পড়েছে সরকারী চিঠির আনা-নেয়ার মধ্যেই। এছাড়া ডাকঘরের অন্যান্য সকল কাজই ডিজিটাইজড হয়েছে। সেই খেয়াল তো আমাদের নেই। প্রযুক্তি যেভাবে আমাদের দাসত্বে বন্দি করে রেখেছে, সেটা ছিন্ন করে আমরা আর বের হই বা কী করে। বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে নিত্য নতুন সব প্রযুক্তি। সেগুলো আশীর্বাদ স্বরূপ অনেক কিছুই এনে দিয়েছে। আবার অনেক কিছু কেড়েও নিয়েছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই নিশাচর, ক্লান্তিহীন চিঠিবাহক ‘রানার’ আজ যেন আমাদের উপহাস করছে। যেখানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই মেসেজ আর ফোন করা যায় সেখানে চিঠি লিখবে কেন প্রেমিক প্রেমিকারা? গত ১৫-২০ বছর আগেও তো প্রেমের মাত্রা এমন ছিল না। আজ আমাদের আর যোগাযোগের সুবিধা বা বন্ধু খোঁজার জন্য কত প্রযুক্তিই তো রয়েছে। প্রেমিক প্রেমিকারা এখন আবেগ বিবর্জিত এক মানব মানবীতে পরিণত হচ্ছে। এটি আমরা বুঝতেও পারছি না। এখন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জারের যুগে এখন কি আর চিঠি লিখতে হয়? সঙ্গীকে একগাদা সময় নিয়ে চিঠি লিখবেন, সেটা কতক্ষণে পৌঁছাবে, সঙ্গী আবার সময় নিয়ে সেটা পড়বে- এত আনুষ্ঠানিকতা আর আমাদের মাঝে নেই। অথচ এমন একটি সময় ছিল যখন সঙ্গীকে চিঠি লিখে তার উত্তর পাওয়ার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে। চিঠিতে সারাদিনের কথা, মনের কথা, কষ্টের কথা, আনন্দের কথা সব লিখে ফেলা হতো। খামের মাঝে চিঠির সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হতো গোলাপের পাপড়ি। আগে বন্ধুও খুঁজে নেওয়া হতো চিঠি দিয়েই। পত্রমিতালীর ধারাটি তখন যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। এখন একটু অন্যভাবে চেষ্টাও তো করলে চলে এখন আর হয়ত আগের মতো মন ভরে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা চিঠি না লিখলেও চলবে। শুধু চিঠির ঐতিহ্য আর আবেগটাকে কিছুটা হলেও অনুভব করার জন্য চিঠির বিষয়টি একটু চর্চা করে দেখতেই পারেন। আগের দিনে তো ভালোবাসার মানুষটির চিঠি দেরিতে পেলে অভিমান হতো। এখন হয়তো ফোন বা মেসেজের উত্তর দেরিতে পেলে অভিমান হয়। সঙ্গীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, ছোট্ট সুন্দর কাগজে ভালোবাসার কিছু কথা লিখে দিন। দেখবেন তার মুখে আলাদা হাসি ফুটে উঠবে। অভিমানও চলে যাবে। আগের দিনে প্রিয়জনকে কোনো উপহার পাঠাতে হলে ডাকযোগেই পাঠাতে হতো। সঙ্গে একটা ছোট চিঠিও থাকতো। এখনও না হয় তেমন কিছু করুন। তাকে বিশেষ দিনে বা এমনিতে কোনো উপহার দিলে তার মধ্যে ছোট একটা চিঠি দিয়ে দিন। সেখানে নিজের সমস্ত আবেগের কথাও লিখে ফেলুন। সেকালের চিঠি গুলোতে আবেগ পুরোপুরি ঢেলে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন গান, কবিতার লাইন তুলে দেওয়া হতো। এতে কখনোবা প্রিয়জনের চোখের কোণে আনন্দের অশ্রুও জমতো। এখনও তেমন করতেই পারেন তো। এই ধরুন দুটো মনের কথা লিখলেন। সেই সঙ্গে প্রিয়জনের পছন্দের কোনো গান বা কবিতার লাইন লিখে দিলেন। এই ভালোবাসা কি আপনি মেসেজ আর চ্যাটিংয়ের মধ্যে পাবেন? মনে হয় না। চিঠি না হলেও ছোট চিরকুট দিন। ছোট্ট একটা কাগজে ভুল হলে সরি লিখে দিন, খুশি হলে ধন্যবাদ লিখে দিন। তার সঙ্গে কোনো কারণে দেখা হলো না, সেদিনের একটা চিরকুট রেখে দিন তার জন্য। মহাদেব সাহা’র সেই ‘চিঠি দিও’ কবিতাটির কয়টা লাইন ধরে বলতে মন চাইলো- করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। এই চিঠি নিয়ে হয়েছে অনেক জনপ্রিয় গান, কত না কবিতা, গল্প আর আজ আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিকতার নির্মম চাবুকাঘাতে কাছে সেই চিঠি মূমুর্ষ হয়ে হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আমার সযত্নে বুকসেল্ফ এ সাজিয়ে রাখা দেশ-বিদেশের সাহিত্যপ্রিয় লেখক-কবিদের চিঠি গুলো যেন নিরব আর করুন ভাবে আমায় বলছে, ‘আবার কলম ধরুন, আমাদের বাঁচান।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *