গোবিন্দগঞ্জে লাপাত্তা ইনডেক্স বিজনেস কো- অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড

মোঃ মতিয়ার রহমান (গাইবান্ধা) গোবিন্দগঞ্জ:
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে কথিত ইনডেক্স বিজনেস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড ও মিডল্যান্ড গ্রুপ অব কোম্পানিজ নামক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের জালে জড়িয়ে শত শত গ্রাহক তাঁদের আমানত হারিয়ে পথে বসতে চলেছে। দৈনিক ও মাসিক সঞ্চয় স্ক্রীম, ডিপিএস, মাত্র ৫ বছরে দ্বিগুণ ও ৮ বছরে তিন গুণ প্রকল্পের নামে শত কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রায় দেড় বছর ধরে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরিচালক ও অন্যান্যরা লাপাত্তা থাকায় মাঠ পর্যায়ে নেই কোনো এর কার্যক্রম। মাঠকর্মী, সুপারভাইজার, ম্যানেজার কিংবা পরিচালক কাউকেই প্রকাশে দেখা না যাওয়ায় এর গ্রাহকদের মধ্যে বিরাজ করছে ত্রাহি ভাব। নিজেদের কাছে শেষ সম্বল হিসেবে সঞ্চয়, ডিপিএস ও ফিক্সড ডিপোজিটের পাশ বই, চেক আর লিখিত স্ট্যাম্প নিয়ে চিন্তায় দিন গড়াচ্ছে আর নির্ঘুম রাত পার করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এমন অবস্থায় আশায় বুক বেঁধে রয়েছে মোবাইলে একটি ম্যাসেজে। সকল গ্রাহককের ফোনে একটি ম্যাসেজই দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ফ্যাক্টরি বিক্রি করা হচ্ছে। বিক্রি হওয়ামাত্র টাকা পরিশোধ করা হবে। টাকা হাতে পাওয়ার পর ফোন দেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সমাজ সেবা অফিসের ০৬/২০১৫ নিবন্ধন নম্বর নিয়ে গোবিন্দগঞ্জে ইনডেক্স বিজনেস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। এর মাঝে রাতারাতি প্রতিষ্ঠানটি মিডল্যান্ড গ্রæপ অব কোম্পানিজ-এ রূপ নেয়। একে একে চারটি প্রকল্প তারা হাতে নেয়। তা বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজনে এর পরিচালকের দৃষ্টি পড়ে এখানে জমা রাখা গ্রাহকদের সঞ্চয় ও ডিপিএসের ওপর। এর সাথে কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাঁচ বছরে আমানত দ্বিগুণ আর আট বছরের তিনগুণ অফারে প্রচারণা চালান গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে। বিশ্বস্ত হতে মেয়াদ শেষে আমানতের দ্বিগুণ ও তিনগুণ অর্থের চেক ও স্ট্যাম্প শুরুতেই গ্রাহকদের দিতে শুরু করেন। এত আরও বেশি নিশ্চিয়তা পাওয়ায় একে একে শত শত গ্রাহক তাদের পোস্ট অফিসে, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমায় রাখা আমানত উত্তোলন করে তাদের কাছে ফিক্সড করেন। কেউ কেউ চাকরির ওপর ঋণ নিয়েও টাকা রেখেছেন। কেউবা জমি বিক্রি বা বন্ধক রেখেও টাকা রেখেছেন ইনডেক্সে। এভাবে শত কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ শেষে শুরু করেন ভবন নির্মাণে। উপজেলার ফাঁসিতলা এলাকায় একটি জায়গায় পাঁচতলা ভবনের কাজ শুরু হয়। যা অসমাপ্ত রেখেই প্রায় দেড় বছর বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এখন আর মাঠ পর্যায়ে নেই কোনো কার্যক্রম। গোবিন্দগঞ্জ পৌরশহরের উপজেলা রোডের পাশে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়, সেটিতেও এখন শুধু তালাই ঝুলছে। প্রধান সাইনবোর্ডটি ধুলো ময়লায় জীর্ণ রূপ পেয়েছে। এর মাঝেই আমানত দ্বিগুণ ও তিনগুণ প্রকল্পে অনেকেরই মেয়াদ পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু অফিসে তালা আর পরিচিত মোবাইল নম্বরটিতে যোগাযোগ করতে না পারায় হতাশা জগদ্দলপাথর রূপ চেপে বসছে গ্রাহকদের বুকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গ্রাহক জানান, আমি ইসলামি ব্যাংক থেকে ৯ লাখ টাকা তুলে এখানে ফিক্সড করি। আমাকে প্রতি ৩ মাস পরপর ৭২ হাজার টাকা মুনাফা দেয়ার কথা। কিন্তু তাঁরা কথা রাখেনি। প্রতিষ্ঠানটি আমাকে টাকার গ্যারিন্টি হিসেবে দি সিটি ব্যাংকের সৌমিক এন্টারপ্রাইজের হিসাব নম্বর ১৪০…৬৯০০১ এর ৪১০১৯.. নম্বর চেকে ৯ লাখ টাকা উত্তোলনের তারিখ দেয়া হয় ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০। সাথে মো. আবুল বাশার এবং তিনজন স্বাক্ষীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি তিনশ টাকার লিখিত স্ট্যাম্পও দেয়। আমি আমার টাকার মাসিক মুনাফা পাইনি এমনকি নির্দিষ্ট তারিখে চেকটি ব্যাংকে জমা করতে চাইলে তাঁরা জানান, চেক জমা করেন না। আমরা আগামী মাসেই আপনার টাকা পরিশোধ করব। কিন্তু এক বছর পার হলেও এখন আর কাউকেই পাচ্ছি না।

অপর এক গ্রাহক জানান, দৈনিক প্রোফিট (ডিপি) স্কীমে আমি ২০ হাজার টাকা রেখেছিলাম। আমাকে ৭% হারে দৈনিক মুনাফা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দেয়নি। এখন মূল টাকাই উদ্ধার সংকটে পড়েছি।

দ্বিগুণ প্রাপ্তির একাধিক গ্রাহক জানান, আমাদের মেয়াদ পূর্ণ হবার পথে। এখন দেখছি সংস্থাই বন্ধ, কেউ ফোন ধরছে না।তিনগুণ প্রাপ্তির একজন গ্রাহক জানান, আট বছরে তিনগুণ হবে লোভে পড়ে লাখ লাখ টাকা সরল বিশ্বািসে পোস্ট অফিস থেকে তুলে তাদের কাছে রেখেছি। এখন আমানত হারানোর শঙ্কায় ঘুম ধরে না।

এমন যখন অবস্থা, তখন ইনডেক্স ও গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিক হিসেবে পরিচিত গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের পার্বতীপুর চামরগাছা গ্রামের মৃত আ. রশিদ সরকারের পুত্র মো. আবুল বাশার রয়েছেন আত্মগোপনে। সাংবাদিকরা ফোন দিলে ফোন রিসভি না করে তাদেরও ম্যাসেজ দেয়া হচ্ছে ফ্যাক্টরি বিক্রি করা হচ্ছে। বিক্রি হলেই টাকা ফেরত দেয়া হবে। প্রশ্ন উঠেছে এমন অবস্থা কত দিন চলবে? গোবিন্দগঞ্জের শত শত স্কুল কলেজ শিক্ষক থেকে সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা ইনডেস্ক ও মিডল্যান্ডের খপ্পরে পড়ে তাদের সর্বস্ব লগ্নি করে এখন অনিশ্চয়তায় পথে বসার অপেক্ষায়। সেই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান দুটির কর্তৃপক্ষের লাপাত্তা ভূমিকায় সচেতন মহল উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় এনে লগ্নিকারীদের অর্থ উদ্ধারের দাবি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *