সুলতান মাহমুদ সজীব এর গল্প “নাহিয়ান ”

নাম তার নাহিয়ান। ভারী দুষ্ট ছেলে।দৌড়-ঝাপ,লাফালাফি সব মিলিয়ে সারা বাড়ি সরব করে রাখে সে। প্রতিদিন চকলেট চুইংগাম তার চাই-ই। বেশি বেশি চকলেট খেয়ে এই বয়সে দাঁত গুলোকে পোকাদের খাদ্যে পরিণত করেছে। ফোকলা দাতে মিষ্টি হাসি দিয়ে সবার মন কেড়ে নিতে চায়।

নাহিয়ান সম্পর্কে তো অনেক কথাই বলে ফেল্লাম অথচ দেখো তার পরিচয় টাই দেওয়া হয়নি। কি ভোলা মনরে বাবা! সে যাই হোক,নাহিয়ান তো নাহিয়ান-ই,তার আবার পরিচয় কি? সেতো একাই দেড়শো! তবু ও তোমাদের মন উস খুশ করছে তাইতো। তবে শোন-নাহিয়ান হচ্ছে তার পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। যাকে বলে একদম সর্বকনিষ্ঠ। চার ভাই বোনের মাঝে চাচাত,মামাত,ফুফাত,পাড়াত ভাই-বোন দিয়ে তার পরিবেশটা একদম ঠাসা। এ কোলে নিবে তো ও গালে ধরবে, এ চুমো দেবে তো ও গোসল করাবে,সব মিলিয়ে এক দম, হই-হই,রই-রই অবস্থা। জন্মের সময় নানী বলেছিল, দেখো কি সুন্দর হয়েছে আমার নানু ভাই। এক দম যেন রাজ পুত্র,যে পঙ্খি রাজ ঘোড়ায় চড়ে হাজার রাজ্যে জয় করে তবেই না আমাদের আমাদের মাঝে এলো। দুষ্ট নাহিয়ান মিষ্টি হাসিতে জবাব দিয়েছিল, যেন বলছিল” হ্যা নানু তুমি ঠিকই বলেছ। নাহিয়ান এখন নার্সারিতে পড়ে। পড়ালেখায় ভালোই তবে একটু বেশি ফাঁকি বাজ। বেড়াতে যাওয়ার কথা বললে এক পায়ে খাড়া কিন্তু পড়ার কথা বললেই ঘুম আসে । ইদানিং স্কুল ফাঁকি দিতে শিখেছে সে। বড় ভাই আদর করে বলে ” স্কুল ফাঁকি না দিলে রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না । আম্মা বলেন,”তোর মাথা,। এসব কথা বলে ওকে সবাই মাথায় তুলেছিস। এখন ওকে শাসন কর নইলে, ,পরে কিন্তু আমাকে বলতে পারবিনা । বাবা সুর মিলায় এ বয়সে একটু এ রকম করবেই বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। নাহিয়ান এমনি চটপটে কিন্তু কোথাও বেড়াতে গেলে এক দম ভদ্র য়েন ভাজা মাছটি উলটিয়ে খেতে জানেনা । নতুন কোন মেহমানের সামনেও সে কোন কথা বলতে চায়না। মা বলেন ’ ঢং দেখে আর বাচিনে , এমনিতে কথার জ্বালায় বাসায় থাকা যায়না আর এখন সে সাধু সেজেছে।

সেদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরলো নাহিয়ান । এক দম চুপচাপ । মা বললেন কিরে চুপ কেন ? বই হারিযে ফেলেছি। অ তাতো ভালই করেছেন । আজ বই হারাবেন তো কাল পেন্সিল হারাবেন, এ রকম করলে লেখা পড়া তো একদম চাঙ্গে উঠবে। শোনেই, ভোঁ করে কেঁদে দিল নাহিয়ান । সে কি কান্না কার ও থামানোর সাধ্য নেই । সন্ধার পর সে বৃষ্টিতে একটু ভাটা পড়ল। সারাদিন কিছুই খেলোনা। গভীর ভাব নিয়ে শুয়ে আছে । বাবা এলেন। সব শুনে বললেন । কে বলেছে আমার ছেলের লেখা পড়া চাঙ্গে উঠবে । আমার ছেলে তো পাইলট হবে। আজ ফ্রান্স তো কাল ইটালি । আজ চীন তো কাল বাংলাদেশ এভাবে সারা বিশ্ব ঘুরবে আমাদের নাহিয়ান, আর তোমরা কিনা যা তা বলছ । এবার নাহিয়ানের মুখে হাসি ফুটল। ফোকলা দাঁতে বলল আমি আর আব্বু সেই বিমানে উঠব, তোমাদের কাউকে নেবনা ,

আজ ১২- ই মে, নাহিয়ানের জন্ম দিন। সকাল থেকেই চলছে জন্ম দিনের উৎসব । অনেক গুলো সার প্রাইজ অপেক্ষা করছে আজ নাহিয়ানের জন্য । এত সারপ্রাইজ যে কম্পিউটার ছাড়া হিসার মেলানো অসম্ভব। নাহিয়ানের মনেও আজ বাড়তি আমেজ। সকাল থেকেই একদম ফুল বাবু সেজে বসে আছেন তিনি , মা বললেন জন্ম দিনের দোহাই দিয়ে স্কুল ফাঁকি দেওয়া চলবে না । বাবা বললেন ’ থাক না আজ সারা বছর ই তো স্কুলে যাওয়া যাবে। সারা বছর গেলেও আজকের দিনটা আলাদা, আজকের দিনে যা করবে সারা বছর তা ই করবে। নাহিয়ান এতক্ষণ চুপ ছিল এবার ঝোপ বুঝে কোপ মারল। গত কাল কিন্তু বিল্টু ভাইয়ার জন্ম দিন ছিল । কিন্তু সে তো কলার খোসায় পিছলে আছাড় খেয়েছে। এখন তার অবস্থা কি হবে আম্মু ? যাও তোমার আর পাকামো করতে হবেনা , স্কুল শেষ করে এসে তবে অনুষ্ঠান শুরু, তার আগে নয়। আম্মার আদেশ যেন সেনা বাহিনী প্রধানের আদেশ, কি আর করা স্কুলে গেল নাহিয়ান ।

আজ বাসায় অনেক মেহমান সবাই নাহিয়ানের কেক কাটার অপেক্ষায় , নানা রকম ব্যানার ফেস্টুন দিয়ে বাড়িটাকে সাজানো হয়েছে। একটিতে লেখা নাহিয়ান অনেক বড় হও। নাহিয়ান তুমি দীর্ঘজীবি হও ইত্যাদি। নাহিয়ানকে, কে কি সারপ্রাইজ দেবে সেই আলোচনাই সবাই ব্যস্ত । কিন্তু কি ব্যাপার নাহিয়ান তো এখনো এলো না। প্রতিদিন তো দুপুরের মধ্যেই এসে যায় ছেলেটা। কিন্তু আজ এ তো দেরী হচ্ছে,কেন ? সবার মনেই প্রশ্নটি উঁকি দিল । পাশের বাড়ির স্কুল ভ্যান চালকের নিকট জানা গেল নাহিয়ান আগেই চলে এসেছে। কিšু‘ গেল কোথায় ছেলেটা। স্কুলের হেড মাস্টারকে ফোন করা হলে স্যার বলল নাহিয়ান তো বারোটার আগেই চলে গেছে। শুনে যেন বাজ পড়ল সবার মাথায়, সবাই উৎকন্ঠিত অজানা আশঙ্কায় কেপে উঠল মন, জন্ম দিনের কথা ভুলে নাহিয়ান কে খুজঁতে বের হল সবাই। না কোথাও নেই, যেন গায়েব হয়ে গেছে ছেলেটা। সময় বয়ে যায়, দুপুর পেড়িয়ে বিকাল হল সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত । কারো মুখে কথা নেই , পুলিশ কে জানানো হয়েছে। কয়েক জন বিভিন্ন জায়গায় খুজছে। মা বার বার ফুফিয়ে কাঁদছে।
পরের দিন একটা ফোন এল । বাবা ধরতেই ও পাশ থেকে বিশ্রী গলায় আওয়াজ এল তোর ছেলে এখন আমাদের হাতে। বাবা বললেন কে তুই ? আমি তোকে পুলিশে দেব। পুলিশে দেবার দরকার নেই আগে তোর ছেলের কথা শোন । নাহিয়ানের কন্ঠ’- বাবা ওরা আমাকে খুব মেরেছে গত কাল থেকে কিছু খেতে দেয়নি, এমন কি পানিও না , আম্মু – আম্মু তুমি আমাকে নিয়ে যাও আম্মু আমার খুব কষ্ট —। এবার শুনলি তো তোর ছেলের কথা । বাবা করুন সুরে বলল, তোমরা আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও । এত সহজে !আজ বিকালে দশ লাখ দিয়ে তোর ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবি । খবরদার পুলিশের ঝামেলায় জড়াবিনা । এত টাকা আমি কোথায় পাব। সেটা তুই তো ভাল জানিস। হি; হি; হি;!ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে গেল ।
টাকা জোগাড় হলো না । ছেলে ও ছাড়া পেলনা । দু’ দিন ধরে আর কোন খবর নেই , বাড়ির প্রতিটি প্রাণী যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে, কারও মুখে কথা নেই।

পরের দিন পত্রিকায় একটি ছবি ছাপা হল নিচে হেডিং , খেলার মাঠের পাশ থেকে স্কুল ছাত্রের লাশ উদ্ধার । আরে এ যে আমাদের নাহিয়ানের ছবি । এর পরের অবস্থা আমার মত ক্ষুদ্র লেখকের পক্ষে বর্ননা করা সম্ভব নয়। পাঠক আপনারাই উপলদ্ধি করুন নাহিয়ানের পরিবারের অবস্থা।
যাই হোক নাহিয়ানকে বাড়ি আনা হল। স্কুলের শার্ট ,প্যান্ট জুতা মোজা সবই ঠিক আছে কিন্তু নেই শুধু নাহিয়ান । সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতই বলতে হয়, “যে এসেছিল সবার পরে , সেই গিয়েছে সবার আগে চলে।” সবাই কে ভীষণ সারপ্রাইজ দিয়ে চলে গেছে নাহিয়ান। সুদূরে ,অসীম নীল আকাশে । আর কখনো ফিরবেনা , কখনো ফোকলা দাতে হাসবে না, কথা বলবে না , না তোমাদের কার ও সাথে সে আর অভিমান করবেনা। কখনো বলবেনা বাবা আমাকে চকলেট কিনে দাও আম্মুর কাছে আর পিঠা খাবার আবদার করবেনা , দুষ্টামি করে কখনো বড় ভাইয়ার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবেনা । বাড়ির পাশের মাঠে আর কখনো তাকে দেখা যাবেনা,স্কুল ফাঁকি দেবেনা ,কাদবেনা,কক্খোনোনা কক্খোনোনা —-।
এরকম হাজারো নাহিয়ান স্কুল থেকে ফেরেনা। সবার অলক্ষেই কিছু অর্থলোভী নর পিচাশদের লালসার শিকার হয় নাহিয়ানরা । আর শোকের মাতম চলে নাহিয়ানদের পরিবার ও তার শুভাকাঙ্খিদের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *